নিয়ম মেনে নিয়োগ পেলেও আইনের গ্যাঁড়াকলে চাকরি হারালেন ৮ কর্মকর্তা
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাত বছরের স্থায়ী চাকরি ছেড়ে মাসছয়েক আগে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ইমারত পরিদর্শক পদে যোগ দিয়েছিলেন দ্বীন ইসলাম। নতুন চাকরির ভিটেমাটি তদন্ত, স্বাস্থ্য পরীক্ষা আর নগরে থাকা-খাওয়ার ব্যয় এখন এখন তিনি ঋণের জালে। নিয়ম মেনে চাকরির ৬ মাস হলেও বেতন পাননি এক টাকাও। হঠাৎ জানতে পারলেন যোগ্যতা প্রবিধানের গ্যাঁড়াকলে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শুধু দ্বীন ইসলাম নন, একই পদে সদ্য নিয়োগ পাওয়া এমন ৮ কর্মকর্তা খালি হাতে চাকরি হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
চলতি বছরের ৬ আগস্ট সিডিএ সচিব মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই আটজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ওই আদেশে বলা হয়েছে, নিয়োগপত্রের শর্তানুযায়ী ‘যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা’ ও ‘নিয়োগপত্র গৃহীত না হওয়ায়’ তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।
অব্যাহতি পাওয়া ৮ ইমারত পরিদর্শক হলেন, দ্বীন ইসলাম লিমন, অনয় সিংহ সুজাত, মো. আবদুর রহমান রিয়াদ, ফাহমিদুল ইসলাম ইবনুল, মো. মুহিদুল হাসান, মো. ইকরামুল হক, ইজতিহাদ ইসলাম খান ও মো. শফিকুল ইসলাম। এর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চাকরি ছেড়ে এই পদে যোগ দেওয়া শাকিরা আক্তার বিথী নামের আরেক কর্মকর্তা ৫ মাস বেতন না পেয়ে সিডিএর চাকরি ছেড়েছিলেন।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই কমিটির সবুজ সংকেত, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা পেরিয়ে যোগদান করার পর এখন কেন সনদের অজুহাত দেওয়া হলো। আর নিয়োগপত্র গৃহীত যদি না হবে, তবে টানা ছয় মাস কীভাবে তারা দপ্তরটিতে নিয়মিত অফিস করানো হলো। কেনই বা তাদের চাকরির শুরুতে জানানো হলো না।
আরও পড়ুন: ১৮তম সুপারিশ বঞ্চিতদের নিয়ে যে সিদ্ধান্ত হলো
সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২১ অক্টোবর ৩১টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ১৮টি পদ ছিল ইমারত পরিদর্শকের। এসব পদের বিপরীতে আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ৩৬৪ জনকে লিখিত পরীক্ষার জন্য মনোনীত করা হয়। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি ফল প্রকাশ করা হয়। পরে ২৫ জানুয়ারি মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তালিকা প্রকাশ করে সিডিএ। উত্তীর্ণ প্রার্থীরা এই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি সিডিএতে যোগদান করেন। এরপর ৩ মার্চ তাদের সংস্থাপন শাখায় যোগদান দেখিয়ে অফিস আদেশ জারি করেন সিডিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল। ৯ মার্চ সিডিএর ইমারত কমিটির চেয়ারম্যান ও এজিএম সেলিম তাদের অথরাইজেশন-১ ও ২ বিভাগে পদায়ন করেন।
জটিলতার পেছনে পুরোনো প্রবিধান
সিডিএর প্রবিধানমালা অনুযায়ী, ইমারত পরিদর্শক পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে এইচএসসি ও দুই বছর মেয়াদি ‘সার্ভে ফাইনাল’ কোর্স পাস। তবে ওই দুই বছরের কোর্সটি ২০০৫ সালেই বন্ধ হয়ে যায় (অনিয়মিতদের জন্য ২০১০-১২ পর্যন্ত চালু ছিল)। পরবর্তীতে সরকার চার বছর মেয়াদি সার্ভে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে। অব্যাহতি পাওয়া ৮ জনই এসএসসি পাসের পর চার বছরের এই আধুনিক ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেছিলেন। সিডিএ কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের চাকরির প্রবিধানমালা সংশোধন না করায় এই সনদসংক্রান্ত আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
চাকরি হারানো অনয় সিংহ সুজাত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাচাই-বাছাই কমিটি পর্যালোচনা করেই তো আমাদের চূড়ান্ত করেছিল। মেধার পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পেলাম। অথচ ছয় মাস বিনাবেতনে খাটিয়ে, মেস ভাড়া ও ভেরিফিকেশনের খরচে লাখ টাকার ঋণের বোঝা বানিয়ে এখন প্রবিধানের অজুহাতে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী বলেন, সিডিএর ভুল ও অবহেলার দায় তারা নেবেন না। নিজেদের অধিকার ও চাকরি ফিরে পেতে খুব শীঘ্রই সম্মিলিতভাবে উচ্চ আদালতের দ্বারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
যোগ্যতা যাচাইয়ের পর নিয়োগ দিয়ে ছয় মাস পর কেন অব্যাহতি এবং এই দায় কার, এমন প্রশ্নে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব (প্রশাসন-৩) আবদুল হাই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা প্রথমে সিডিএকে এবং কাজ না হলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে লিখিত আবেদন করতে পারেন।
যোগাযোগ করা হলে সিডিএ সচিব মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম বলেন, নিয়োগপত্র গৃহীত না হওয়ায় তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপত্র গৃহীত ছাড়া ছয় মাস দাপ্তরিক কাজ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য না করে জানান, এ বিষয়ে চেয়ারম্যান বিস্তারিত বলতে পারবেন। তিনি অফিসে ফিরলে আলোচনা করে জানানো সম্ভব হবে।