পে স্কেলের চূড়ান্ত প্রস্তাব আটকে আছে কোথায়?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে সরকার অটল। তবে নতুন বেতনকাঠামো কীভাবে কার্যকর হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ করে বেতন ও ভাতা একসঙ্গে দেওয়া হবে, নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে মন্ত্রিসভাকে।
নতুন পে স্কেলে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর আলোচনা হয়েছে। তবে পে স্কেলের চূড়ান্ত প্রস্তাব এখনো সচিব কমিটির পর্যালোচনা ও সুপারিশের পর্যায়েই রয়েছে। ফলে গেজেট প্রকাশের আগে আরও কয়েকটি প্রশাসনিক ও নীতিগত ধাপ পেরোতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সচিব কমিটির পর্যালোচনা শেষ করে সুপারিশ চূড়ান্ত করা। নতুন কাঠামোর সম্ভাব্য আর্থিক ব্যয়, গ্রেডের সংখ্যা, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বিভিন্ন ভাতা এবং পেনশনের ওপর প্রভাব বিবেচনা করে সমন্বিত প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হলে তা অর্থ বিভাগের যাচাই এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া গেলে গেজেট বা বাস্তবায়ন প্রজ্ঞাপন জারির পথ খুলবে।
অর্থাৎ, পে স্কেল কার্যকর করার আগে এখনো একাধিক ধাপ বাকি।
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বিবেচনার বিষয় আর্থিক সক্ষমতা। মূল বেতন বাড়লে শুধু কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ব্যয় বাড়বে না। বাড়বে বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, গ্র্যাচুইটি, অবসর সুবিধা ও পেনশনের ব্যয়ও। স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন কাঠামো প্রয়োগ করা হলে সামগ্রিক ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে।
এ কারণে পূর্ণাঙ্গ পে স্কেল একসঙ্গে কার্যকর করা হবে, নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে—এ প্রশ্নটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। সরকারের বিবেচনায় থাকা একটি সম্ভাব্য পথ হলো প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা। পরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতা সমন্বয় করা। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি আদেশ জারি হয়নি।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পক্ষে যুক্তি হলো, এতে প্রথম বছর সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। তবে কর্মচারীদের আশঙ্কা, শুধু মূল বেতন বাড়িয়ে ভাতা দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত রাখা হলে নতুন পে স্কেলের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আয়ের বড় অংশ বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আরও পড়ুন: পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে সচিব কমিটিতে নতুন সিদ্ধান্ত
এদিকে বুধবার সচিব কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা যায়, নতুন পে স্কেল নিয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এখন আরও দুই থেকে তিন দিন সচিব কমিটি কারিগরি বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করবে। এরপর সচিব কমিটির সুপারিশ চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠতে পারে।
বর্তমানে মূল বেতনের সঙ্গে দেওয়া বিশেষ সুবিধা নতুন কাঠামোয় বহাল থাকবে, মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বিত হবে, নাকি বাতিল হবে এ বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। সাধারণত নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে অন্তর্বর্তী সুবিধা নতুন মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। তবে এবার কোন পদ্ধতি নেওয়া হবে, তা গেজেট প্রকাশের আগে নিশ্চিত নয়।
নতুন পে স্কেল নিয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে। মূল বেতন বাড়লে পেনশন কতটা সমন্বয় হবে, সর্বনিম্ন পেনশন বাড়বে কি না এবং পুরোনো ও নতুন পেনশনভোগীদের সুবিধার ব্যবধান কীভাবে নির্ধারিত হবে এসব বিষয়ও চূড়ান্ত প্রস্তাবের অংশ হওয়ার কথা। পেনশন ধাপে বাড়ানো এবং অপেক্ষাকৃত কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বেশি সুবিধা দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে অর্থ বিভাগ এখনো কোনো নির্দিষ্ট হার বা সূত্র প্রকাশ করেনি।
নতুন কাঠামো কার্যকরের আগে ও পরে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের সুবিধা সমন্বয়ের স্পষ্ট পদ্ধতি না থাকলে বৈষম্যের অভিযোগ উঠতে পারে।
পে স্কেল বাস্তবায়ন শুধু নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি বড় ধরনের প্রযুক্তিগত কাজও। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, কর্তন, ভাতা, আয়কর ও পেনশনের হিসাব বর্তমানে সমন্বিত বাজেট ও হিসাবব্যবস্থা আইবিএএস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
নতুন গ্রেড ও মূল বেতন কার্যকর করতে সফটওয়্যারে নতুন বেতন ম্যাট্রিক্স যুক্ত করতে হবে। প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান বেতন নতুন কাঠামোর কোন ধাপে নির্ধারিত হবে, সেটিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাবের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সার্ভিস রেকর্ড, পদ, গ্রেড ও ইনক্রিমেন্টের তথ্য হালনাগাদ না থাকলে বেতন নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে ১৬ জুলাই পর্যন্ত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কোনো আইবিএএস সার্কুলার বা সরকারি নির্দেশনা প্রকাশ হয়নি।
এদিকে বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে পে স্কেল পর্যালোচনা কমিটির ষষ্ঠ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ এবং আগের বেতনকাঠামোর বিভিন্ন ত্রুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, নতুন পে স্কেল নিয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। তবে সচিব কমিটি আরও দুই থেকে তিন দিন কারিগরি বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করবে। এরপর চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে সুপারিশ মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠতে পারে। মন্ত্রিসভায় নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ধাপসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
এরপর প্রস্তাবটি আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ভেটিং শেষে প্রধানমন্ত্রী সারসংক্ষেপ অনুমোদন করলে গেজেট প্রকাশ করা হবে। আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
এদিকে সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে সরকার অটল। তবে দেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘এটার সিদ্ধান্ত হয়েছে, এটি আমরা গ্রহণ করেছি এবং বাস্তবায়ন হবে। তবে এটা হবে ক্রমান্বয়ে। আমাদের বর্তমান আর্থিক যে প্রেক্ষাপট, যে কঠিন সময় আমরা অতিক্রম করছি, এটাকে মাথায় নিয়ে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে।’