সিলেটবাসী আপনাদের ভালোবাসায় আমি ধন্য: ডিসি সারওয়ার
সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম সিলেটবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের ভালোবাসায় আমি ধন্য, ভালো থাকুন সিলেটবাসী। আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে এই আবেগঘন বার্তা লেখেন ডিসি সরোয়ার।
স্ট্যাটাসে তিনি উল্লেখ করেন, বিদায় সিলেট। ভালো থাকুন সিলেটবাসী। আপনাদের ভালোবাসায় আমি ধন্য।
এর আগে, রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উন-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে মো. সারওয়ার আলমকে ‘জনস্বার্থে’ প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করে সারওয়ার আলম নিজেই জানান, আগামী সোমবার তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগদান করতে বলা হয়েছে। তবে তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নতুন কোনো জেলা প্রশাসকের নাম একই প্রজ্ঞাপনে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে ২৪ ঘণ্টার নোটিশে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার এবং নতুন ডিসি নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জানা যায়, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথরে পাথর লুটের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ২১ আগস্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে প্রত্যাহার করা হয়। তার পরিবর্তে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয় মো. সারওয়ার আলমকে। তবে যে সাদাপাথরকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তাকে সিলেটে আনা হয়েছিল, সেই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও তার দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
সিলেটে দায়িত্ব গ্রহণের পর সারওয়ার আলম বেশ কিছু উদ্যোগের কারণে আলোচনায় আসেন। নগরের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ, ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি বন্ধ এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে দালালমুক্ত করার উদ্যোগ প্রশংসিত হয়।
আরও পড়ুন: বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৯ কর্মকর্তাকে চাকরিতে স্থায়ী করল সরকার
এছাড়া সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে ধীরগতি, নগরের ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো অপসারণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রগতির অভাবসহ বিভিন্ন কারণে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
সবশেষ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ। গত ১২ জুন মাজার পরিদর্শনে গিয়ে দানবাক্সে তালা লাগানোর নির্দেশ দেন সারওয়ার আলম। পরে ১৮ জুন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয় এবং দান সংগ্রহে ব্যবহৃত পুরোনো তিনটি ঐতিহাসিক ডেগ সিলগালা করা হয়। নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয় আনসার সদস্য। পরবর্তীতে শনিবার দানবাক্স ও সিলগালা করা ডেগগুলোর ওপর নজরদারির জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কাজও শুরু হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত আটটি ক্যামেরা স্থাপন করা হয় এবং পর্যায়ক্রমে মোট ১২টি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনার কথা জানান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মাসুদ রানা।
জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পুরোনো ডেগ সিলগালার প্রতিবাদে একদল ভক্ত দরগাহ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন। তারা ‘লালে লাল-বাবা শাহজালাল’ স্লোগান দিয়ে প্রশাসনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
মাজারের খাদিম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ভাঙচুরে জড়িত ছিল, তাদের ইন্ধনেই শাহজালাল (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতার নামে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এটি মাজার ও অলি-আউলিয়া বিরোধী কর্মকাণ্ড। দানের অর্থ শুধু খাদেমরা গ্রহণ করেন না; মাজার, মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর উন্নয়নেও তা ব্যয় করা হয়। হিসাব চাওয়া যেতে পারে, কিন্তু জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম তখন দাবি করেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাজারের দানের অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি অনিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু ছিল। মাজারে আগত মানুষের দান জনসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত এবং সেই অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দানের কোনো অর্থ সরকার গ্রহণ করবে না। বরং সব ধরনের অনিয়ম দূর করে মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে সেই অর্থ ব্যয় করা হবে। এ উদ্দেশ্যে একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে খাদেম, মসজিদ ও মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের নিয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। পাশাপাশি মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
মাজারকেন্দ্রিক এই বিতর্কের মধ্যে রবিবার দেশ-বিদেশে বসবাসরত সিলেটের ৬৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ২১ আগস্ট তিনি সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন।
২৭তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা সারওয়ার আলম র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আলোচিত ছিলেন। সিনিয়র সহকারী সচিব পদে থাকাকালীন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে শতাধিক ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে ব্যাপক প্রশংসিত ছিলেন সারওয়ার আলম।
২০২০ সালের ৯ নভেম্বর তাকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। পরে গত বছরের ১৪ আগস্ট উপসচিব পদে পদোন্নতি পান তিনি।