তিন ধাপে নয়, একবারে পে স্কেল চান সরকারি চাকরিজীবীরা
আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের শুরুতেই অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন এই বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে গঠিত পর্যালোচনা কমিটি আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) পুনরায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডেকেছে, যেখান থেকে বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপরেখা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল আভাস দিয়েছে।
কমিটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবারের পে স্কেলে মূলত নিম্ন স্তরের সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিপরীত দিকে, উচ্চপদস্থ বা ওপরের স্তরের কর্মকর্তারা কিছুটা কম সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে সরকারি পেনশনভোগীদের স্বস্তি দিতে পেনশনের হার শতভাগের বেশি বৃদ্ধির জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর নতুন বেতন কাঠামোর এই উদ্যোগ জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সাধারণ চাকুরিজীবীরা আশা করলেও, সরকারের ধাপে ধাপে পে স্কেল দেওয়ার পরিকল্পনায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তারা এই নতুন পে-স্কেল তিন ধাপে না দিয়ে একবারে বা এক ধাপে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
যশোরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা মো. কাউসার আহমেদ এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে জানান, সরকার পুরো বেতন বৃদ্ধি করতে চাইলেও প্রথম বছর মূল বেতনের অর্ধেক, দ্বিতীয় বছর বাকি অর্ধেক এবং তৃতীয় বছর ভাতার বর্ধিতাংশ দেওয়ার যে পরিকল্পনা করেছে, তা চাকুরিজীবীদের জন্য এক প্রকার আর্থিক ক্ষতি। কারণ বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশনের ধারা আগামী বছরগুলোতেও একই থাকবে না। ফলে ধাপে ধাপে বেতন বাড়লে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রকৃত সুবিধা অনেকটাই কমে যাবে। উদাহরণ টেনে তিনি আক্ষেপ করেন, ২০১৫ সালে যে বাসা ১০ হাজার টাকায় ভাড়া পাওয়া যেত, ২০২৬ সালে তা ২৫ হাজার টাকাতেও মিলছে না; অথচ গত ১১ বছরে প্রতি বছর মাত্র ৫ শতাংশ হারে যে ইনক্রিমেন্ট হয়েছে, তা ক্রমবর্ধমান বাজারদরের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
আরও পড়ুন: আগামী বাজেটেই নতুন পে স্কেল—বাস্তবায়ন কীভাবে, তা নিয়ে কথাবার্তা চলছে: অর্থমন্ত্রী
উল্লেখ্য, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও বাজারদরের সামঞ্জস্য রাখতে এর আগে ২০১৫ সালে সর্বশেষ অষ্টম পে স্কেল দেওয়া হয়েছিল, যেখানে বেতন প্রায় দ্বিগুণ করার পাশাপাশি সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিল করে নতুন নিয়মে ইনক্রিমেন্ট চালু করা হয়। তবে মাঝে এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, চিকিৎসা, বাসা ভাড়া ও যাতায়াত খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন পে স্কেল নিয়ে সৃষ্ট এই টানাপোড়েন প্রসঙ্গে সাবেক সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান জানান, নির্দিষ্ট সময় পর পর পে স্কেল দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলেই স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র আটটি পে স্কেল হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, অষ্টম পে স্কেলের সময় প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন সমন্বয়ের দাবি জানানো হয়েছিল এবং সরকার তাতে একমতও হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হারের সাথে সমন্বয় না করে কেবল বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে বেতন বাড়ানো হয়, যার ফলে ব্যয়ের তুলনায় আয় অনেক পিছিয়ে পড়ে। মূলত এই ক্ষোভ থেকেই নতুন পে স্কেলের জন্য আন্দোলন শুরু হয়।
সাবেক এই সচিব আরও মনে করেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ হয়তো হুবহু কার্যকর হবে না, কারণ কোনো সুপারিশই শতভাগ বাস্তবায়িত হয় না। তবে গণকর্মচারীদের যৌক্তিক দাবি হলো—সরকার যতটুকু সুবিধাই চূড়ান্ত করুক, তা যেন তিন বছরের জটিলতায় না ফেলে একবারে কার্যকর করে। তিনি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, অধিকাংশ সাধারণ সরকারি কর্মচারীরই দুর্নীতি বা ঘুষ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তাই রাষ্ট্র থেকে এখন যে বেতন দেওয়া হচ্ছে তা দিয়ে সংসার চালানো তাদের জন্য কঠিন বাস্তবতা। তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বিশাল এই পে স্কেল একবারে সম্পূর্ণ কার্যকর করলে সরকারের ওপর হঠাৎ বড় ধরনের বাজেট ও আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে, আর সেই সংকট এড়াতেই মূলত এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা করছে প্রশাসন।