ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথকে ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য কেন ‘বিশেষ’ বলা হচ্ছে?
এটি শুধু ২০২৬ বিশ্বকাপের একটি সেমিফাইনাল নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উত্তপ্ত ও ঐতিহাসিক এক দ্বৈরথের নতুন অধ্যায়। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই শুধু মাঠের ৯০ মিনিটে সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিতর্ক, প্রতিশোধের গল্প, ম্যারাডোনা থেকে মেসির মতো কিংবদন্তিদের স্মৃতি সব মিলিয়ে এই ম্যাচ পরিণত হয়েছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বুধবার আটলান্টায় যখন দুই পরাশক্তি ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ থাকবে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের অপেক্ষায়।
দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’, ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ডের ট্র্যাজেডি ও চার বছর পর তার প্রতিশোধ এবং ওয়েম্বলিতে এমন এক বিতর্কিত লাল কার্ড যা ফুটবলে লাল ও হলুদ কার্ডের প্রবর্তনের কারণ হয়েছিল—সব মিলিয়ে এই দুই দলের ম্যাচ মানেই এক টানটান উত্তেজনা।
রাজনৈতিক পটভূমি ও মালভিনাস যুদ্ধ
১৯৮০-এর দশক থেকে এই দুই দেশের ফুটবল ম্যাচ কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এতে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ইস্যু। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (আর্জেন্টাইনদের কাছে যা ‘আইলাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত) নিয়ে গ্রেট ব্রিটেন এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত ঘটে। যদিও বুধবারের ম্যাচে খেলোয়াড়দের মনোযোগ পুরোপুরি ফুটবলেই থাকবে, তবে মাঠের লড়াইয়ে এই ঐতিহাসিক ক্ষত এবং আবেগ সবসময়ই দুই দলের খেলোয়াড়দের তাড়া করে ফেরে।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ
২০০৫ সালের এক প্রীতি ম্যাচের পর (যেটিতে ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে জিতেছিল) এবং ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপে এবারই প্রথম এই দুই দল মুখোমুখি হচ্ছে। পূর্বের ম্যাচগুলোর কিছু স্মরণীয় ঘটনা নিচে আলোচনা করা হলো-
১৯৬৬ বিশ্বকাপ: ওয়েম্বলিতে বিশৃঙ্খলা ও জার্সি বদল নিষিদ্ধ
১৯৬২ বিশ্বকাপে এই দুই দলের প্রথম দেখায় ইংল্যান্ড ৩-১ ব্যবধানে জিতলেও, ১৯৬৬ সালের ওয়েম্বলির কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে। ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতলেও আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে লাল কার্ড দেওয়া এবং জিওফ হার্স্টের গোলটি অফসাইড ছিল বলে দাবি করায় আর্জেন্টিনায় এই ম্যাচকে ‘শতকের সেরা চুরি’ বলা হয়।
রেফারি রুডলফ ক্রেইটলিনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান এবং পরে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্য সংরক্ষিত লাল গালিচায় বসে প্রতিবাদ করেন। এই ঘটনার পর খেলোয়াড় ও রেফারির ভাষার জটিলতা দূর করতে ফিফা ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হলুদ ও লাল কার্ডের নিয়ম চালু করে। ম্যাচের পর ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ‘পশু’ (animals) বলে কটূক্তি করেন এবং নিজের খেলোয়াড়দের আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের সাথে জার্সি বদল করতে নিষেধ করেন।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ: ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’
মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ১৯৮৬ সালের ২২ জুন ম্যাচের ৫১ মিনিটে তৈরি হয় বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক ও বিতর্কিত মুহূর্ত। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিল্টনের মাথার ওপর দিয়ে হাত দিয়ে বল জালে জড়ান।
ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখেও রেফারি গোলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এর ঠিক চার মিনিট পর ম্যারাডোনা মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে শতাব্দীর সেরা গোলটি করে আর্জেন্টিনাকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা সেই ঐতিহাসিক মন্তব্যটি করেন ‘কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’
আর্জেন্টাইনদের কাছে এই জয়টি ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত তাদের তরুণদের জন্য এক ধরনের ‘প্রতীকী প্রতিশোধ’, যা ম্যারাডোনা নিজেই পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন। তবে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার টেরি বুচার কিংবা গোলরক্ষক শিল্টন ম্যারাডোনার এই ‘প্রতারণা’র জন্য তাকে কখনোই ক্ষমা করতে পারেননি।
১৯৯৮ বিশ্বকাপ: বেকহ্যাম বনাম সিমিওনে
ফ্রান্স বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের এক ম্যাচে আর্জেন্টিনার দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মারার অপরাধে লাল কার্ড পান ইংল্যান্ডের তৎকালীন ‘গোল্ডেন বয়’ ডেভিড বেকহ্যাম। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া ইংল্যান্ড টাইব্রেকারে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় এবং ব্রিটিশ মিডিয়া বেকহ্যামকে খলনায়ক বানিয়ে শিরোনাম করে: ‘১০ জন বীর সিংহ, আর একটি বোকা ছেলে।’
সিমিওনে পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি বেকহ্যামকে উস্কে দিয়ে লাল কার্ডের সুবিধা নিয়েছিলেন। এই হারের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের বাসের ভেতর জার্সি ঘুরিয়ে উদযাপনের দৃশ্য ইংলিশ খেলোয়াড় পল স্কোলস ও স্টিভ ম্যাকমানাম্যানকে দীর্ঘদিন ক্ষুব্ধ করে রেখেছিল।
আরও পড়ুন: ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মহারণে নজর থাকবে যেসব তারকার ওপর
২০০২ বিশ্বকাপ: বেকহ্যামের মধুর প্রতিশোধ
২০০২ সালের বিশ্বকাপে জাপানের সাপ্পোরোতে ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলেই ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে। ৪৪ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে বেকহ্যাম চার বছর আগের সেই লাল কার্ডের গ্লানি মুছে মধুর প্রতিশোধ নেন।
যদিও সেই পেনাল্টি নিয়ে বিতর্ক ছিল। মাইকেল ওয়েনকে ডি-বক্সে ফাউল করার অপরাধে পেনাল্টিটি দেওয়া হয়েছিল। ফাউলকারী ডিফেন্ডার (বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের কোচ) মাউরিসিও পচেত্তিনো পরবর্তীতে জানান, ওয়েনকে তিনি স্পর্শই করেননি, তবে রেফারিকে বোকা বানাতে ওয়েন বেশ চতুরতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এই জয়ের পর পল স্কোলস স্বস্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘১৯৯৮ সালের পর আমরা কোনোভাবেই ওদেরকে আবার আমাদের সামনে ওভাবে উদযাপন করতে দিতে পারতাম না।’
বুধবার আটলান্টার সেমিফাইনালে যখন বর্তমান ফুটবল বিশ্বের দুই মহানায়ক লিওনেল মেসি এবং হ্যারি কেইন নিজ নিজ দেশের জার্সি গায়ে মুখোমুখি দাঁড়াবেন, তখন এই ৬০ বছরের পুরোনো বৈরিতার আগুনে আরও একবার ঘি পড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই।