১৭ জুন ২০২৬, ১১:২০

আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করেই কেন কাঁদলেন মেসি, রহস্য জানালেন নিজেই

আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করে কাঁদছেন মেসি  © সংগৃহীত

২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি যেন দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর ফাইনালে। লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নিজের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচে যেখানে জোড়া গোল করে রূপকথা লিখেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই যেন ক্যানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে শুরু করলেন ৩৮ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। 

চার বছরের ব্যবধানেও ধার কমেনি বিন্দুমাত্র; কাতারের সেই ফাইনালের জোড়া গোলের পর এবার নিজের রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই আলজেরিয়াকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়ার রাতে তুলে নিলেন চোখ ধাঁধানো এক হ্যাটট্রিক। এই জাদুকরী পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপে নিজের ১৬তম গোলটি পূর্ণ করে জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ড স্পর্শ করেছেন।

এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসের যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়েছেন। ​তবে ক্যানসাসের এ ঐতিহাসিক রাতটি মূর্ত হয়ে থাকবে ম্যাচের ১৭তম মিনিটের এক আবেগঘন দৃশ্যের কারণে। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নেমে ম্যাচের ঠিক ১৭তম মিনিটে যখন তিনি প্রথম গোলটি করেন, তখনই মাঠে উদযাপনের সময় তিনি কেঁদে ফেলেন। 

ম্যাচ শেষে এ কান্নার রহস্য উন্মোচন করে মেসি জানান যে, তিনি ফুটবলের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন একটি বিষয়ের কারণে কেঁদেছিলেন। গত কিছু দিন ধরে তিনি খুব কঠিন ব্যক্তিগত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তবে দলের পুরো প্রতিনিধি দল এবং সতীর্থরা সবসময় পাশে থেকে তাকে প্রচুর শক্তি জুগিয়েছে। 

নিজের ফুটবলপ্রেম এবং ফর্ম নিয়ে তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই ফুটবল তার আবেগ এবং যখন তিনি ভালো ফর্মে থাকেন, তখন মাঠে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেন। এটি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ হলেও তিনি এখনো দারুণ ফর্মে আছেন এবং টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই এমন একটি কঠিন জয় পাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমার্ধে বেশ লড়াই করতে হলেও দ্বিতীয় অর্ধে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান তৈরি করতে সক্ষম হন।

​এই এক ম্যাচেই লিওনেল মেসি ফুটবল ইতিহাসের গোল ও অ্যাসিস্টের উভয় তালিকার একদম চূড়ায় বসে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছেন। ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার মাধ্যমে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোল সংখ্যা এখন ১৬টি, যার ফলে তিনি জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছুঁয়ে সর্বকালের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। শুধু গোল করাই নয়, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর কারিগর হিসেবেও তিনি এখন চূড়ায়। 

বিশ্বকাপে তার মোট অ্যাসিস্ট সংখ্যা ৮টি, যার মাধ্যমে তিনি ইতোমধ্যে আর্জেন্টিনার ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনার গড়া বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ৮টি অ্যাসিস্টের ঐতিহাসিক রেকর্ডটি স্পর্শ করে যৌথভাবে শীর্ষে বসে আছেন। একই সাথে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে (৩৮ বছর ৩৫৮ দিন) হ্যাটট্রিক করার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড নিজের নামে করলেন মেসি, যা ওলেগ সালেঙ্কো বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো তারকাদের রেকর্ডকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। 

আরও পড়ুন: মেসির হ্যাটট্রিক জাদুতে উড়ে গেল আলজেরিয়া

পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বয়সে এসে একই ম্যাচে জোড়া গোল করার ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলার বহু পুরোনো রেকর্ডটিও ভেঙে নিজের করে নিয়েছেন তিনি। ​ক্যানসাসের গ্যালারিতে উপস্থিত ৮০ হাজারেরও বেশি ভক্তদের ধন্যবাদ জানিয়ে মেসি বলেন, তারা কাতারে হোক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে, সবসময় বিশাল ত্যাগ স্বীকার করে হাজির থাকেন এবং তাদের কারণেই মনে হয় যেন দল নিজেদের মাটিতেই খেলছে। 

রেকর্ড ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে একই ম্যাচে ক্লোসা ও ম্যারাডোনা, দুই মহীরুহের রেকর্ড স্পর্শ করা আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন কেন ফুটবল বিশ্ব তাকে বিনম্র শ্রদ্ধায় সর্বকালের সেরা হিসেবে কুর্নিশ জানায়। মেসির এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড লিখেছেন, মেসি একটি উন্মাদ।

অন্যদিকে ম্যাচ শেষে ফক্স স্পোর্টসের বিশেষ স্টুডিওতে সুইডিশ কিংবদন্তি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, সে যদি এই বিশ্বকাপটা জেতেও, তবে সেটা হবে তার শোকেসের সাধারণ আরেকটি ট্রফি মাত্র; সে এই ট্রফিটা জিতল কি জিতল না- তাতে এখন আর বিন্দুমাত্র কিছু আসে যায় না, ও এখন ফুটবলেরও ঊর্ধ্বে চলে গেছে। 

তিনি বলেন, কাতার বিশ্বকাপের সেই সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পরও যে মেসির ক্ষুধার অবসান ঘটেনি, ১৭তম মিনিটের কান্না পেরিয়ে ক্যানসাসের এই বিধ্বংসী রূপ তারই অকাট্য প্রমাণ।