১৬ জুন ২০২৬, ১০:৫৮

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার অবস্থান বিপরীত মেরুতে

প্রতীকী ছবি   © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশে ফুটবল মানেই এক উন্মাদনার নাম, যেখানে আপামর ফুটবলপ্রেমী প্রধানত দুটি শিবিরে বিভক্ত—একটি ব্রাজিলের চিরচেনা হলুদ-সবুজ, অন্যটি আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী আকাশী-সাদা। প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বকাপ এলে এ দেশের রাস্তাঘাট ছেয়ে যায় বিশালাকার পতাকায়, চায়ের দোকানগুলো রূপ নেয় তর্কের যুদ্ধক্ষেত্রে, আর পাড়া-প্রতিবেশীরা মেতে ওঠে এক অলিখিত দ্বৈরথে।

​তবে মাঠের এই নান্দনিক ফুটবল ও ট্রফির লড়াই নিয়ে যখন বাঙালি সমর্থকরা তর্কে মশগুল, তখন খুব কম মানুষই মাঠের বাইরে এই দুই লাতিন পরাশক্তির আসল ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে নজর দেন। মাঠের সবুজ ঘাসের লড়াই ছাপিয়ে বাস্তব পৃথিবীর এক চরম ও জটিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা অবস্থান করছে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সংকট।

ইসরায়েল পক্ষে আর্জেন্টিনার অবস্থান
বর্তমান রাজনৈতিক প্রশাসনের অধীনে আর্জেন্টিনা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসরায়েলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ এবং সোচ্চার মিত্রে পরিণত হয়েছে। আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন দেশটির দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে তেল আবিবের সাথে এক প্রকাশ্য ও অবিচল অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।

​আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে আর্জেন্টিনা ধারাবাহিকভাবে জাতিসংঘের এমন সব প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়ে আসছে, যা ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে কিংবা কোনো শর্ত বা জিম্মি মুক্তি ছাড়া যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। শুধু তা-ই নয়, আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রশাসন তাদের অফিশিয়াল দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে। 

এই অত্যন্ত বিতর্কিত পদক্ষেপটি জেরুজালেমের ওপর ইসরায়েলের আঞ্চলিক দাবির প্রতি আর্জেন্টিনার প্রকাশ্য সংহতিকেই নির্দেশ করে, যা আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিরই এক প্রতিচ্ছবি। আর্জেন্টিনার বর্তমান সরকারের কাছে ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়াটা এক ধরনের সভ্যতার মেলবন্ধন এবং পশ্চিমা ও মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক নীতির সাথে নিজেদের সরাসরি যুক্ত করার একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

আরও পড়ুন: কাল সকালে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা, খেলা দেখবেন যেভাবে

​ফিলিস্তিনের অধিকার রক্ষায় ব্রাজিলের নেতৃত্ব
​অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নেতৃত্বে লাতিন আমেরিকার অপর পরাশক্তি ব্রাজিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফিলিস্তিনের অধিকার আদায়ের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা তাদের প্রতিবেশী দেশ আর্জেন্টিনার ঠিক বিপরীত।

​ব্রাজিল ২০১০ সালেই ১৯৬৬ সীমানা অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং আজ পর্যন্ত সেই অবস্থানে অনড় রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও ব্রাজিল ইসরাইলি নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এর বড় প্রমাণ হলো, দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলায় ব্রাজিল সরাসরি সমর্থন ব্যক্ত করেছে। 

গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার হোলোকাস্টের সাথে তুলনা করলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিহাসের সবচেয়ে নিম্নপর্যায়ে পৌঁছায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল লুললাকে 'পারসোনা নন গ্রাটা' বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলেও ব্রাজিল তাদের অবস্থান থেকে এক চুলও নড়েনি। বরং ব্রিকস, জি-২০ এবং জাতিসংঘের প্রতিটি অধিবেশনে তারা ফিলিস্তিনের পক্ষে জোরালো দাবি উত্থাপন করে চলেছে।

​ক্রীড়ামোদীদের মধ্যে প্রায়ই একটি কথা শোনা যায়—‘খেলাধুলার সাথে রাজনীতি জড়াবেন না।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক ফুটবল কখনোই রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন ছিল না এবং কখনো হবেও না। বড় বড় ক্রীড়া সংস্থা, জাতীয় দলের জার্সি এবং আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলো স্বভাবগতভাবেই জাতীয়তাবাদ, সফট পাওয়ার বা আন্তর্জাতিক কূটনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

​বিশ্বের এমন গভীর ও পদ্ধতিগত সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে ‘রাজনীতি-মুক্ত’ বা নিরপেক্ষ দাবি করাটা নিজেই একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রকৃত নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই; গভীর সংকটের সময়ে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা খেলাধুলাকে একটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জগৎ মনে করা প্রকারান্তরে চলমান বৈষম্য ও বর্তমান স্থিতাবস্থাকেই টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

​তাই ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটের আকাশে যখন ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ে, তখন অজান্তেই সমর্থকরা বিশ্বের দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী মতাদর্শের প্রতীক বহন করেন। কোটি বাঙালির হৃদয় জয় করা এই চিরন্তন বৈরিতা কেবল ফুটবল দর্শনের লড়াই নয়, বরং এটি হাজার মাইল দূরের এক খণ্ডিত ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।