০২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৯

যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্প, নাসা ও নৌবাহিনীতে আলো ছড়াচ্ছেন যবিপ্রবির শাওন

ড. শেখ মোঃ আলী জাকের শাওন  © টিডিসি সম্পাদিত

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আর গবেষণার অদম্য স্পৃহায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ড. শেখ মোঃ আলী জাকের শাওন। 

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে সিনিয়র প্রসেস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি পারমাণবিক খাতের বাইরে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং মার্কিন নৌবাহিনীর বিভিন্ন প্রযুক্তিগত প্রকল্পেও অবদান রাখছেন এই মেধাবী বাঙালি তরুণ।

যশোরের ছেলে শেখ মোঃ আলী জাকের শাওনের শিক্ষাজীবনের শুরু যশোরের বিএএফ শাহীন কলেজে। সেখান থেকে ২০০৭ সালে এসএসসি ও ২০০৯ সালে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হন যবিপ্রবির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। স্নাতক শেষে চট্টগ্রামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যালে প্রসেস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন তিনি। তবে পেশাগত জীবনের শুরুতেই নিজের লক্ষ্যকে সীমাবদ্ধ রাখেননি শাওন। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।

যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, রিও গ্র্যান্ড ভ্যালিতে ভর্তি হন তিনি। সেখানে অর্জন করেন প্রেসিডেনশিয়াল গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ। পরবর্তী সময়ে কেমিক্যাল অ্যান্ড বায়োমলিক্যুলার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পিএইচডি করার সুযোগ পান ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে তিনি সেপারেশন প্রসেস নিয়ে গবেষণা করেন।

গবেষণার পাশাপাশি তার কাজের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে। ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির ন্যানোডেই পোস্টার প্রতিযোগিতায় তার গবেষণা তৃতীয় স্থান অর্জন করে। তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য পানি থেকে বিষাক্ত অ্যামোনিয়া অপসারণ করে তা সরাসরি সারে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে একদিকে জলাশয়ের দূষণ কমানোর সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে প্রচলিত শক্তিনির্ভর হেবার-বশ পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

এছাড়া শিল্পকারখানায় জ্বালানি খরচ কমানো ও চক্রাকার অর্থনীতি বাস্তবায়ন নিয়েও কাজ করেছেন শাওন। তিনি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পারভাপোরেশন মেমব্রেন তৈরি করেছেন, যা কম খরচে জৈব দ্রাবক থেকে পানি অপসারণে কার্যকর। পাশাপাশি লিথিয়াম আহরণের বিকল্প প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা করছেন তিনি।

আরও দেখুন: ধৈর্যের সীমা পেরোলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে: রুমিন ফারহানাকে নাদিয়া পাঠানের হুঁশিয়ারি 

শাওনের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে। এর মধ্যে রয়েছে নেচার কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, নেচার ওয়াটার, ন্যানো এনার্জি ও জার্নাল অব মেমব্রেন সায়েন্স এর মতো জার্নাল।

উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়েও নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছেন শাওন। ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগঠন বাংলাদেশি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন তিনি এবং সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পিএইচডি সম্পন্ন করার পর শাওন যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে। বর্তমানে তিনি সেখানে সিনিয়র প্রসেস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পারমাণবিক শিল্পের পাশাপাশি তার কাজ যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা খাতের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। এই পেশাগত কাজের মাধ্যমে নাসা ও মার্কিন নৌবাহিনীর বিভিন্ন প্রকল্পে অবদান রাখার সুযোগ হয়েছে শাওনের।

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শেখ মো. আলী জাকের শাওন বলেন, ‘একাডেমিক সিজিপিএ ভালো রাখার পাশাপাশি, গবেষণার প্রতিও আগ্রহী হতে হবে। একই সঙ্গে নিজের দেশ ও লাল-সবুজের পতাকাকে বুকে ধারণ করতে হবে।’

নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যবিপ্রবির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সুযোগ পেলে এমআইটি ও ভ্যান্ডারবিল্টের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারিকুলামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যবিপ্রবির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কারিকুলাম উন্নয়নে কাজ করতে চাই। সুযোগ পেলে বেসরকারি খাতের সহযোগিতা নিয়ে আমাদের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ল্যাবকে দেশের অন্যতম সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবে পরিণত করতে চাই।’

দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়ে শাওন বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। সুযোগ পেলে দেশের শিক্ষা ও জ্বালানি খাতে ভূমিকা রাখতে চাই। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যার কারিকুলাম হবে বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য।’