গণঅভ্যুত্থানে ইন্টারনেট বন্ধ, সেখান থেকেই স্বাধীন নেটের ভাবনা মাভাবিপ্রবি অধ্যাপকের
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় অফলাইন ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা স্বাধীন নেট। মোবাইল বা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ছাড়াই নিজেদের মধ্যে ডিজিটাল তথ্য আদান-প্রদানের এই প্রযুক্তি এবার প্রদর্শিত হবে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬ এ।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুল আলমের প্রস্তাবিত এ প্রকল্পে ব্যবহারকারীরা মোবাইল হটস্পটের মাধ্যমে একটি প্রাথমিক সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারবেন। একাধিক ব্যবহারকারী এভাবে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হলে গড়ে উঠবে একটি জটিল স্থানীয় নেটওয়ার্ক। এতে প্রচলিত মোবাইল বা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই নিজেদের মধ্যে ডিজিটাল তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হবে।
উদ্ভাবনের পেছনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সহকারী অধ্যাপক আরিফুল আলম বলেন, ‘২৪-এর জুলাই আন্দোলনের সময় সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে গেলে তথ্যপ্রবাহ কার্যত থেমে যায়। আশপাশে কী ঘটছে, সেটিও জানাও তখন বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তখনই প্রশ্ন জাগে- তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এত সহজে একটি পুরো জাতিকে কীভাবে তথ্যের অন্ধকারে রাখা সম্ভব? সেই ভাবনা থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে অফলাইন ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা স্বাধীন নেট উদ্ভাবনের চেষ্টা শুরু করেন তিনি।’
প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হলো ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জরুরি পরিস্থিতিতেও মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা। প্রচলিত ইন্টারনেট ব্যবহারে বিদেশি অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ওপর নির্ভর করতে হয়, যার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এর বিপরীতে স্থানীয় পর্যায়ে ‘স্বাধীন নেট’ ব্যবহার করে ইন্টারনেট ছাড়াই সীমিত পরিসরে তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব হতে পারে।
দেশের উচ্চ জনঘনত্বও এ প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে এটি কার্যকর হতে পারে। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও ব্যবহারকারীরা স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময় করতে পারবেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের অভ্যন্তরে নিরাপদ যোগাযোগের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার সম্ভাবনাময়।
আরও দেখুন: আজই শেষ হচ্ছে ষষ্ঠ শ্রেণির বাদপড়া শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট বন্ধ বা যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাকে সামনে রেখে এমন বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভারতের মণিপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনায় তথ্যপ্রবাহে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা এ ধরনের প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।
স্বাধীন নেট এখনো একটি পরীক্ষামূলক উদ্ভাবন। তবে ইন্টারনেটবিহীন স্থানীয় ডিজিটাল যোগাযোগের ধারণাটি ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও বিস্তৃত করা গেলে জরুরি পরিস্থিতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সংস্থার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।
বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬ এ মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টলে প্রদর্শিত হবে স্বাধীন নেট। জুলাইয়ের অন্ধকার থেকে উঠে আসা এই উদ্ভাবন যেন একটি প্রশ্নই সামনে আনে- ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলেও কি যোগাযোগ থেমে থাকবে? যেখানে সমস্যা আছে সেখানে সমাধানও লুকিয়ে আছে। স্বাধীন নেট এর ভাবনা বলে দিচ্ছে, প্রযুক্তির বিকল্প পথ তৈরি করা সম্ভব।