দুই বছরের ক্যানসারযুদ্ধ শেষে জন্মদিনেই জীবনপ্রদীপ নিভল মাভাবিপ্রবির সোহানের
জীবনকে ভীষণ ভালোবাসতেন তিনি। স্বপ্ন ছিল সুস্থ হয়ে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফিরবেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবেন, ক্লাসে বসবেন, নিজের অসমাপ্ত পথচলা শেষ করবেন; কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। দীর্ঘ দুই বছর ক্যানসারের সঙ্গে কঠিন লড়াই শেষে নিজের ২২তম জন্মদিনেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সোহান।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাজ্জাদ। তিনি মাভাবিপ্রবির অর্থনীতি বিভাগের ১১তম ব্যাচের তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি মাভাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির (মাভাবিপ্রবিসাস) একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন।
সাজ্জাদের জন্ম ২০০৪ সালের ২৯ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীর পশ্চিম মাদারবাড়ী এলাকায়। যে দিনটি প্রতিবছর তার জীবনে নতুন বয়সের আনন্দ নিয়ে আসত, সেই দিনটিই এবার হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ দিন। জন্মদিনের শুভেচ্ছার বদলে পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীদের কাছে দিনটি হয়ে উঠল গভীর শোকের দিন।
আরও পড়ুন: এক ছাতার নিচে নেই সব আঘাতের চিকিৎসা, মুমূর্ষু রোগীই দৌড়ান হাসপাতালে হাসপাতালে
পরিবার ও সহপাঠীদের সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে সাজ্জাদের শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে। শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম। প্রথম দফায় অস্ত্রোপচার করা হলেও কিছুদিন পর আবার ক্যানসার ফিরে আসে। রোগের বিস্তার ঠেকাতে প্রায় ছয় মাস আগে ভারতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়।
একটি পা হারিয়েও ভেঙে পড়েননি সাজ্জাদ; বরং নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে আবার হাঁটবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরবেন—এমন আশাতেই দিন কাটছিল তার। চিকিৎসার পর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল।
কিন্তু সেই আশার আলো বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। পরবর্তী সময়ে তার ফুসফুসে ক্যানসার শনাক্ত হয়। দ্বিতীয়বার চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা শারীরিক অবস্থার জটিলতা বিবেচনায় বাংলাদেশে ফিরে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। দেশে ফেরার পর অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার জীবনের শেষ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
আরও পড়ুন: বই দেখে পরীক্ষা দেওয়ার ঘটনায় ৪ শিক্ষার্থী বহিষ্কার, ২ শিক্ষককে অব্যাহতি
দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যেও সাজ্জাদ নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, পড়াশোনার খোঁজ নিতেন এবং একদিন সুস্থ হয়ে আবার ক্যাম্পাসে ফেরার আশা করতেন। জীবনের প্রতি তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি কাছের মানুষদের কাছে ছিল সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রতীক।
সহপাঠীদের ভাষ্য, সাজ্জাদ ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত, বন্ধুবৎসল এবং সবার প্রিয় একজন মানুষ। কঠিন অসুস্থতার সময়ও তিনি হতাশাকে নিজের ওপর ভর করতে দেননি। হাসিমুখে কথা বলতেন, সবার খোঁজখবর নিতেন এবং সবসময়ই বিশ্বাস করতেন তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন।
সোহানের মৃত্যুর খবরে মাভাবিপ্রবির অর্থনীতি বিভাগ, মাভাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি, সহপাঠী ও বন্ধুদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শোক প্রকাশ করে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন।
দীর্ঘ দুই বছরের ক্যানসারযুদ্ধ শেষে ২২ বছর বয়সে থেমে গেল একটি স্বপ্নময় জীবনের পথচলা। যে দিনে সাজ্জাদ পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন, ঠিক সেই দিনেই নিভে গেল তার জীবনের আলো। রেখে গেলেন পরিবার, বন্ধু, সহপাঠী এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এক অপূরণীয় শূন্যতা।