গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে লিফট নষ্ট, ভোগান্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) ১০ তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের তিনটি লিফটের একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। একটি লিফট ছয়তলা পর্যন্ত চলাচল করে এবং অন্য দুটি ১০ তলা পর্যন্ত ওঠানামা করলেও এর একটি নষ্ট থাকায় বর্তমানে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীকে কার্যত একটি লিফটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে লিফটের সামনে দীর্ঘ অপেক্ষা, সময়মতো ক্লাস-পরীক্ষায় পৌঁছাতে না পারা এবং বাধ্য হয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০তলা একাডেমিক ভবনে ৩০টি বিভাগের শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি ও বিভাগীয় কার্যালয় রয়েছে। এসব বিভাগে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী এবং কয়েক শ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের ব্যবহারের বিপরীতে লিফটগুলোর ধারণক্ষমতাও তুলনামূলক কম। ফলে একটি লিফট অচল থাকায় বাকি লিফটটির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সকাল ৯টা থেকে বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষা শুরু হওয়ায় এ সময় লিফটের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ৮ম, ৯ম কিংবা ১০ম তলায় যেতে অনেক সময় ১৫ থেকে ২০ মিনিট, কখনো তারও বেশি সময় লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে ক্লাস বা পরীক্ষার হলে পৌঁছানো নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
যেসব বিভাগে পরীক্ষা চলমান রয়েছে, তাদের ভোগান্তি আরও বাড়ে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, লিফটে জায়গা পাওয়ার পর কোনো শিক্ষক এলে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের নেমে যেতে হয়। পরে তাঁদের সিঁড়ি দিয়ে একাধিক তলা উঠে পরীক্ষার হলে যেতে হয়। এতে পরীক্ষার আগে শারীরিক ক্লান্তির পাশাপাশি মানসিক চাপও তৈরি হয়।
এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সকাল ৯টার ক্লাস বা পরীক্ষা থাকলে অনেক আগে থেকেই লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে হয়। একটি লিফ্ট নষ্ট থাকায় চাপ আরও বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত লিফট না পেলে ৮-১০ তলা পর্যন্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। দ্রুত লিফটটি সচল করা প্রয়োজন।’
আরও পড়ুন: ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা দুই মাস পেছানোর চিন্তা
এদিকে একাডেমিক ভবনের লিফ্ট নষ্ট থাকায় শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বয়স্ক শিক্ষক-কর্মকর্তা, শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি এবং ভারী জিনিসপত্র বহনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সমস্যায় পড়ছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে চালু থাকা লিফটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় সেখানেও দীর্ঘ অপেক্ষার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
শুধু লিফট সংকট নয়, বিদ্যমান লিফটগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে লিফটে আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ তাদের। এসব ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একাধিকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গত ২০ এপ্রিল সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী লিফটে ওঠার পর সেটি মাঝপথে আটকে যায় বলে জানা গেছে। এতে লিফটের ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং কিছু সময় আটকে থাকেন।
এর আগে ১৬ জুন ২০২৬ এক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিফটের কল বাটন নষ্ট হওয়ার একটি ছবি প্রকাশ করে লেখেন, ‘এত দিন পড়ে যেত লিফট, এখন পড়ে গেছে লিফটের কল বাটনই।’
লিফটের নিরাপত্তা নিয়ে এর আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক নাজমুল হক শাহীন। ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিফটে আগে দুবার আটকে পড়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন এবং লিফ্ট-সংক্রান্ত একটি ঘটনার তদন্ত দাবি করেন। ওই পোস্টে তিনি লিফটটিকে ‘মৃত্যুকফিন’ হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
আরও পড়ুন: পদত্যাগ নাকি সরিয়ে দেওয়া হলো পিএসসি চেয়ারম্যানকে?
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচতলা প্রশাসনিক ভবনেও কোনো লিফ্ট নেই। প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এ ভবনে তিনটি বিভাগের শ্রেণিকক্ষ ও বিভাগীয় কার্যালয় রয়েছে। ফলে এসব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহার করতে হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) সরাফত আলী বলেন, ‘লিফটের ভেতরের একটি সুইচ কাজ করছে না। এটি এই মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বন্ধ রাখা হয়েছে। লিফটটি সচল করতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার অনুমোদনের জন্য উপাচার্য দপ্তরে কাগজ পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে উপাচার্য স্যার অনুমোদন দিয়েছেন। এখন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করে দ্রুত লিফটটি সচল করা হবে।’
শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু অচল লিফটটি দ্রুত সচল করাই নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা এড়াতে লিফটগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ১০ তলা ভবনে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় লিফটের সংখ্যা ও ধারণক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, একাডেমিক ভবনে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত হওয়ায় লিফট কোনো বিলাসিতা নয়, এটি স্বাভাবিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই লিফটের নিরাপত্তা ও সচলতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।