২১৯ গবেষণার বিপরীতে নতুন ভিসির ১৮— সাইটেশনে একজন ৩ হাজার, আরেকজনের খুঁজে পাওয়া যায়নি
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম রুবেল। তবে শিক্ষা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং একাডেমিক অর্জনের দিক থেকে সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন অনেকটাই এগিয়ে। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম দীর্ঘ দুই দশক ধরে শাবিপ্রবির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনে অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম রুবেল ফ্যাকাল্টি ফার্স্ট, প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক এবং চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল লাভ করেন। তার প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ১৮টি। এর মধ্যে ৬টি আন্তর্জাতিক জার্নাল ও বাকিগুলো দেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এসব জার্নালের দুটি বিশ্বখ্যাত স্কোপাসে ইনডেক্সড।
আরও পড়ুন: ধারেকাছেও নেই দুজন, শিক্ষায়-গবেষণায় ৭ জনই পিছিয়ে বিদায়ীদের চেয়ে
অন্যদিকে সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন গবেষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
এছাড়া ২০১৩ সালে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের পক্ষ থেকে রসায়নে নোবেল পুরস্কারের প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য আমন্ত্রণ পান অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী। বিষয়টিকে তার গবেষণা জীবনের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়।
গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি বিশ্বের বিভিন্ন নাম করা প্রতিষ্ঠানের ফেলোশিপ অর্জন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জার্মানির আলেকজান্ডার ফন হামবোল্ট ফেলোশিপ, ডিএএডি ফেলোশিপ, যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ ফেলোশিপ, জাপান সরকারের জাসসো ফেলোশিপ এবং ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলোশিপ। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানির Georg-August University of Göttingen-এ ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রিতে ফুল-টাইম রিসার্চ প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
আরও পড়ুন: শিক্ষায়-গবেষণায় অপসারণ করা উপাচার্যদের তুলনায় পিছিয়ে নতুন ৭ উপাচার্য, এগিয়ে এক
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপক সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরীর প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ২১৯টিরও বেশি এবং তিনি চারটি বই রচনা করেছেন। পলিমার কম্পোজিট, পরিবেশ দূষণ, জুট প্রযুক্তি, ন্যানোম্যাটেরিয়াল এবং টেকসই প্রযুক্তি নিয়ে তার গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। গবেষণার প্রভাবের ক্ষেত্রেও দুই উপাচার্যের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গুগল স্কলারে অধ্যাপক সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরীর গবেষণার সাইটেশন ৩ হাজার ২৮৮ এবং তার h-index ২৮।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল, বোর্ড অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের সদস্য ছিলেন। একই সঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও সিনেট সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও গবেষণা মূল্যায়ন কার্যক্রমেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বিসিএস পরীক্ষার বিশেষজ্ঞ হিসেবে ২০০২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) গবেষণা অনুদান মূল্যায়ন কমিটি এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিয়োগ কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সরকারের অধীন বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
আরও পড়ুন: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ১৮ বছরের ইতিহাসে ৬ উপাচার্যের পাঁচ জনই দুর্নীতি-হত্যা মামলার আসামি!
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্যরা শিক্ষা-গবেষণায় তুলনামূলক পিছিয়ে থাকলেও শিক্ষাবিদদের মত, একাডেমিক অভিজ্ঞতার তুলনায় প্রশাসনিকভাবে অভিজ্ঞদের এই পদে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটি একটি প্রশাসনিক পদ। এখানে প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকদের পদায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। বহু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক একাডেমিকভাবে এগিয়ে থাকলেও তারা প্রশাসনিকভাবে দক্ষ হবেন— বিষয়টি এমন নয়। এ ছাড়া ভাল গবেষকরা এ ধরনের পদে এলে গবেষণাও অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই গবেষকের কাছ থেকে প্রাপ্য গবেষণা থেকে দেশ বঞ্চিত হয়।
তবে ‘ভাল একাডেমিশিয়ান না হলেও’ উপাচার্যদের শিক্ষা-গবেষণা সম্পর্কে ভাল ধারণা এবং পরিচালনার সক্ষমতা থাকতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। এই শিক্ষাবিদ বলেন, লক্ষ্য রাখতে হবে যে দল-বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হলেও দেখেশুনে যে দক্ষ ব্যক্তিটাকে দেয়া হয়। একইসাথে উপাচার্যদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত এবং মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের দিকটি খেয়াল রাখা প্রয়োজন।