তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত, তবুও দায়মুক্তি পেলেন শিক্ষা প্রকৌশলের ৫ কর্মকর্তা
কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের ১৫ কোটি টাকার অগ্রিম বিল পরিশোধের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল তদন্ত কমিটি। পরবর্তীতে হয়েছিল বিভাগীয় মামলাও। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখার তৎকালীন এক যুগ্মসচিব এবং এক উপসচিবকে ‘ম্যানেজ’ করে মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন অভিযুক্ত পাঁচ কর্মকর্তা। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) সিলেট কার্যালয়ের এমন গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও অভিযুক্তদের বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া কর্মকর্তারা হলেন- নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল হাকিম, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হাবীবুর রহমান, মো. আতিকুর রহমান, সহকারী প্রকৌশলী রামীম ইবনে জাহানের এবং মো. উজ্জ্বল বখত। এদের মধ্যে মো. নজরুল হাকিম বর্তমানে ইইডির ময়মনসিংহ জেলার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বাকিরা এখনো সিলেটেই কর্মরত বলে জানা গেছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দাবি, বিষয়গুলো মন্ত্রণালয়ে তারা লিখিতভাবে জানিয়েছেন। এছাড়া পুরো কাজও সম্পন্ন হয়েছে। সেজন্য তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই ঠিকাদারদের কাজের অগ্রিম বিল দেওয়া হয়েছে। পরে কাজ শেষ করা হলেও যখন বিল দেওয়া হয়েছে, তখনকার সময় এটি গুরুতর অপরাধ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের অন্তত ৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণকাজে কাজের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত বা অগ্রিম বিল পরিশোধের অভিযোগ ওঠে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অগ্রিম হিসেবে ১৫ কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের তদন্ত সংক্রান্ত নথিতে সিলেট জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজে অগ্রগতি ও বিল পরিশোধের মধ্যে অসঙ্গতির বিষয়টি উঠে আসে।
তাদের মতে, অনিয়মের ঘটনায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তদন্তে যেখানে কাজ না করেই অতিরিক্ত বিল দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল, সেখানে পরবর্তী পর্যায়ে বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত’ না হওয়ার ভিত্তিতে অব্যাহতি দেওয়া হলো কীভাবে? আর যদি অভিযুক্ত কর্মকর্তার দেওয়া নথি-প্রমাণে অভিযোগ খণ্ডিত হয়ে থাকে, তাহলে আগের তদন্তে কী ধরনের ঘাটতি ছিল সেই প্রশ্নও উঠেছে।
ইইডির সিলেট কার্যালয়ের এই ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করেছিলেন ইইডি সিলেটের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আখতারুজ্জামান। বর্তমানে তিনি ঢাকায় কর্মরত রয়েছেন। জানতে চাইলে আখতারুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, `আমি যখন তদন্ত করেছিলাম, তখন বিষয়টির সত্যতা ছিল। অর্থাৎ পুরো কাজ শেষ না করেই বিল দেওয়া হয়েছিল। কিছু আর্থিক লেনদেনের বিষয় জড়িত ছিল। পরবর্তীতে কী কারণে তাদের বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তা বলতে পারছি না।’
বিভাগীয় মামলা দায়ের এবং মামলা প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণে জানা গেছে, ‘সিলেটের অন্তত ৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণকাজে কাজের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত বা অগ্রিম বিল পরিশোধের অভিযোগ ওঠে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অগ্রিম হিসেবে ১৫ কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের তদন্ত সংক্রান্ত নথিতে সিলেট জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজে অগ্রগতি ও বিল পরিশোধের মধ্যে অসঙ্গতির বিষয়টি উঠে আসে। প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সিলেটে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়িত ও চলমান অনেক কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক ছিল না। অনেক কাজ দীর্ঘদিনেও শেষ হয়নি এবং বেশ কিছু নির্মাণকাজের মান নিয়েও তদন্ত প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। এমন সব অনিয়ম হওয়ার পরও ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সাবেক সচিব সিদ্দিক জোবায়েরের স্বাক্ষর করা বিভাগীয় মামলা সংক্রান্ত নথিতে এসব কর্মকাণ্ডকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এমনকি অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ড কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়। তবে কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো দেওয়া হয়েছে দায়মুক্তি।
চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপনে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল হাকিম, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হাবীবুর রহমান, মো. আতিকুর রহমান, রামীম ইবনে জাহানের এবং সহকারী প্রকৌশলী মো. উজ্জ্বল বখতকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। দায়মুক্তি দেওয়া প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন সাবেক সচিব রেহানা পারভীন।
শৃঙ্খলা শাখার কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ
অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার নেপথ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের শৃঙ্খলা শাখায় ওই সময় দায়িত্ব পালন করা এক যুগ্মসচিব এবং এক উপসচিবকে ‘ম্যানেজ’ করার ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পেছনে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেনি সূত্রটি।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করে। ফলে নির্মাণকাজে অনিয়ম, কাজ শেষ না হলেও বিল পরিশোধের মতো অনিয়মের ঘটনা প্রমাণ হওয়ার পরও বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ঘটনা মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে।
কার বিরুদ্ধে কী ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় মামলা সংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইইডি সিলেটের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো: নজরুল হাকিম দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ অসম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত বিল প্রদান করেছেন। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, সে সময় তিনি গোয়াইনঘাটের বীর মঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণে মেসার্স কুশিয়ারা ট্রেডিংকে ৩০ লাখ, সদরের রসময় উচ্চ বিদ্যালয়ে মেসার্স ইসহাক এন্ড সন্সকে ৮ লাখ টাকা, গোলাপগঞ্জের আতাহারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে মেসার্স এসই-এই (জেভি)-কে ৫০ লাখ, কানাইঘাটের মুলাগুল হারিছ চৌধুরী অ্যাকাডেমিতে মেসার্স এসই-এই (জেভি)-কে ৭০ লাখ, দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার আলিম মাদ্রাসায় মেসার্স এসই-এই (জেভি)-কে ২৫ লাখ টাকা, সদরের শাহজালাল বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে মেসার্স হক কনস্ট্রাকশনকে ২৫ লাখ, জকিগঞ্জের আব্দুর রাজ্জাক স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে মেসার্স কুশিয়ারা ট্রেডিংকে ১৬ লাখ এবং গোলাপগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে মেসার্স এসই-এই (জেভি)-কে ৫ লাখ টাকার অতিরিক্ত বিল দিয়েছেন।
সহকারী প্রকৌশলী রামীম ইবনে জাহান বীর মঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয়ের কাজে ৩০ লাখ, আতাহারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের কাজে ৫০ লাখ, মুলাগুল হারিছ চৌধুরী অ্যাকাডেমির কাজে ৭০ লাখ, আব্দুর রাজ্জাক স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের কাজে ১৬ লাখ এবং গোলাপগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের অবকাঠামো নির্মাণে ৫ লাখ টাকার অতিরিক্ত বিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়েছিলেন।
সহকারী প্রকৌশলী রামীম ইবনে জাহান বলেন, ‘টাকা লেনদেন করে এ ধরনের বিষয় সমাধান হয় না। ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। যার কারণে আমাদের বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’
আরও খবর: প্রেস মালিকদের পকেটে যাচ্ছে সরকারের ৩৬০ কোটি টাকা
উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান ‘নির্বাচিত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় বীর মঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪-তলা অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কুশিয়ারা ট্রেডিংকে ৩০ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল দিয়েছিলেন।
উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হাবীবুর রহমান মুলাগুল হারিছ চৌধুরী অ্যাকাডেমির ভবন নির্মাণে মেসার্স এসই-এই (জেভি)-কে কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় ৭০ লাখ এবং আব্দুর রাজ্জাক স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের কাজে মেসার্স কুশিয়ারা ট্রেডিংকে ১৬ লাখ টাকার অতিরিক্ত বিল দিয়েছেন।
সহকারী প্রকৌশলী মো. উজ্জল বখত রসময় উচ্চ বিদ্যালয় ও শাহজালাল বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রকল্পে যথাক্রমে ৮ ও ২৫ লাখ টাকার অতিরিক্ত বিল দিয়েছিলেন।
জানতে চাইলে সহকারী প্রকৌশলী মো. উজ্জল বখত কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ঘটনার সত্যতা পায়নি, এজন্য বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহার করেছে।’ তাহলে প্রথম কমিটি কীভাবে অনিয়মের প্রমাণ পেল? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে প্রশ্ন লিখে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।