সিটি কলেজের ১৯৮ শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ ‘অবৈধ’
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকা সিটি কলেজে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ অবৈধ বলে জানা গেছে। এ তালিকায় ১৮ জন অধ্যাপক এবং ৩৭ জন সহযোগী অধ্যাপক রয়েছেন। শুধু তাই নয়; প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সদস্যরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রায় দুই কোটি টাকা সিটি অ্যালাউন্স নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি সিটি কলেজের নানা বিষয় নিয়ে অডিট করেছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। সংস্থাটির অডিট কর্মকর্তা চন্দন কুমার দেব এবং সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে এ অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।’
২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২২৯ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদে ব্যয় করা হয়েছে, যা আর্থিক বিধির লঙ্ঘন। প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আয় ব্যাংকে জমা দিয়ে চেকের মাধ্যমে ব্যয় করার বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। এ ধরনের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনাকে প্রতিবেদনে সাময়িক আত্মসাতের শামিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া অডিট প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে ১০৫ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জন অধ্যাপক, ৩৭ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৪৬ জন প্রভাষক, কয়েকজন সহকারী অধ্যাপক ও ডেমোনস্ট্রেটর রয়েছেন। তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের নিয়োগ বিধি অনুসরণ করা হয়নি।
অনেক ক্ষেত্রে শুধু পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত ছিলেন না, নিয়োগ কমিটি গঠন এবং গভর্নিং বডির অনুমোদনও দেখাতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
স্টাফিং প্যাটার্ন পর্যালোচনা করে ডিআইএর অডিট টিম জানিয়েছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার বাইরে অতিরিক্ত ৩৪ জন অধ্যাপক এবং ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক কর্মরত রয়েছেন। তারা যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সংস্থাটি।
আর্থিক অনিয়ম নিয়ে ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২২৯ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদে ব্যয় করা হয়েছে, যা আর্থিক বিধির লঙ্ঘন। প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আয় ব্যাংকে জমা দিয়ে চেকের মাধ্যমে ব্যয় করার বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। এ ধরনের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনাকে প্রতিবেদনে সাময়িক আত্মসাতের শামিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ঠিকাদারি ও বিভিন্ন ক্রয়ে উৎসে ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকা রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে পাবলিক পরীক্ষার সম্মানীর বিপরীতে উৎসে আয়কর কর্তন না করায় আরও ২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় ধরে বিধিবহির্ভূত গভর্নিং বডির সদস্যরা ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা সিটি অ্যালাউন্স হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ওই অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে চালানের কপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দাখিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
‘নিয়মানুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে’ -অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম, ডিআইএ পরিচালক
ডিআইএ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানে মহিলা শিক্ষক কোটা ৪৪ শতাংশ পূরণ রয়েছে এবং ভবিষ্যতের নিয়োগে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ নারী কোটা বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা, ক্রয় কমিটির মাধ্যমে সব ধরনের ক্রয়, হিসাবপত্র সংরক্ষণ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা জোরদার এবং ভ্যাট-কর সংক্রান্ত সরকারি বিধি যথাযথভাবে অনুসরণের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলমান কয়েকটি মামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণসংক্রান্ত একটি রিট মামলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে দুটি মামলা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত দুটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান অডিট টিমকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী নিয়ামুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি ইতিমধ্যে এ প্রতিবেদনটি পেয়েছি। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে ২০২২ সালের এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করা রহস্যজনক, বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যমূলক বলে মনে করি। তাছাড়া প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে তারা এখন বরখাস্ত ও পলাতক।’
যাদের নিয়োগে অনিয়ম
অধ্যাপক মো. শাহীন আহমেদ, অধ্যাপক মো. আরিফুজ্জামান হাওলাদার, অধ্যাপক মো. মোখলেছুর রহমান, অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রব, অধ্যাপক গাজী আবুল বাকি, অধ্যাপক আখতার খান মজল, অধ্যাপক হারুন অর রশিদ, অধ্যাপক তোজাম্মেল হুমায়ুন, অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী মিন, অধ্যাপক সুমন্ত ভট্টাচার্য, অধ্যাপক জহির উদ্দিন, অধ্যাপক বিজয় সাহা, অধ্যাপক ফারুক আহমেদ সুলতানা, অধ্যাপক ড. গুঞ্জন নাসিম, অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক খান মোহাম্মদ, অধ্যাপক আবদুল হোসেন, অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হোসেন এবং অধ্যাপক মো. গোলাম কবির।
‘আমি ইতিমধ্যে এ প্রতিবেদনটি পেয়েছি। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে ২০২২ সালের এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করা রহস্যজনক, বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যমূলক বলে মনে করি। তাছাড়া প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে তারা এখন বরখাস্ত ও পলাতক’ -কাজী নিয়ামুল হক, অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত), ঢাকা সিটি কলেজ
সহযোগী অধ্যাপক ক্যাটাগরিতে রয়েছেন, সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল আজিজ, সহযোগী অধ্যাপক তাপসী সাহা, সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক মো. হানিফ আলী, সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ হারিছ হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক নুরুল হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইমরানুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক মোখতার আলম, সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক মো. আজিজুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক এম. এম. জাহাঙ্গীর ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক মাহফুজুল আলম বেপারী, সহযোগী অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক মো. আব্দুল্লাহ রহমান, সহযোগী অধ্যাপক মো. শাহীনুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুর রহমান।
আরও পড়ুন: ১০৮৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিলের চূড়ান্ত নোটিশ বোর্ডের, দেখুন তালিকা
সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক মাহাবুব সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন, সহযোগী অধ্যাপক বিশ্বজিৎ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ দিদারুল হক, সহযোগী অধ্যাপক আয়েশা আক্তার, সহযোগী অধ্যাপক মহিউদ্দিন হাওলাদার, সহযোগী অধ্যাপক অলিন কর্মকার, সহযোগী অধ্যাপক মো. তোফাজ্জল হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক কবিতা সুন্দরমালী, সহযোগী অধ্যাপক রওশন আরা বেগম, সহযোগী অধ্যাপক শাহিদা পারভীন, সহযোগী অধ্যাপক জাহেদুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক মো. ওয়াহিদুল আলম, সহযোগী অধ্যাপক দেওয়ান আব্দুল মাতিন, সহযোগী অধ্যাপক পলাশ চন্দ্র সাহা, সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদুল আলম রেজা, সহযোগী অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক হারুনার রশিদ, সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন এবং সহযোগী অধ্যাপক মো. আহসান হাবিব।
এছাড়া প্রভাষক মো. আবুল কাদের সিদ্দিক, প্রভাষক মো. গোলাম মোস্তফা, প্রভাষক মো. শেখ মোশাররফ হোসেন, প্রভাষক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম মিন্টু, প্রভাষক মাহমুদ আক্তার, প্রভাষক জহিরুল ইসলাম, প্রভাষক অপরাজিতা সাহা, প্রভাষক শাহিনুর ইসলাম, ডেমোনস্ট্রেটর মো. ইমাম হোসেন, প্রভাষক মো. আজিজুর রহমান, প্রভাষক সুমাইয়া আফরোজ, প্রভাষক আলী আজম, প্রভাষক আবুল হোসেন, প্রভাষক আহসান ফেরদৌসী, প্রভাষক হোসনেয়ারা সুলতানা বৃষ্টি, প্রভাষক নজরুল ইসলাম, প্রভাষক মো. রফিকুল ইসলাম, প্রভাষক জহিরুল ইসলাম, প্রভাষক আফরোজা রহমান মিঠু, প্রভাষক মিজানুর রহমান, প্রভাষক সিদ্দিকুর রহমান।
প্রভাষক মনিরুল সাহা, প্রভাষক নূরুল আলম মজল, প্রভাষক সুব্রত শিকদার, প্রভাষক সালমা পারভীন, প্রভাষক মো. ফরিদুল আলমগীর, ডেমোনস্ট্রেটর মো. বেল্লাল আলী, প্রভাষক জুবাইর আহমেদ, ডেমোনস্ট্রেটর শাহিন আক্তার, প্রভাষক রফিকউদ্দিন আহমেদ, ডেমোনস্ট্রেটর আরিফ উদ্দিন, প্রভাষক আখি চক্র, ডেমোনস্ট্রেটর সিদ্দিক আহমেদ, প্রভাষক মো. জাহিদুল ইসলাম, ডেমোনস্ট্রেটর মো. আব্দুল হাসান, ডেমোনস্ট্রেটর এম. এম. কবির, প্রভাষক মাহমুদা পারভীন, প্রভাষক সঙ্গীতা ধর, প্রভাষক তাসলিমা খাতুন, প্রভাষক আনোয়ারা আলম শেলী, প্রভাষক শাহানারা বেগম, প্রভাষক মো. মিলন সরকার, প্রভাষক নূরজাহান আক্তার, প্রভাষক মোসলেমা বেগম, প্রভাষক তপতী হাওলাদার, প্রভাষক জয়ন্ত কুমার, মো. আব্দুর রাজ্জাক, সহকারী মো. আব্দুর রাজ্জাক, সহকারী গাউসিয়া খালেদুন্নেছা এবং সহকারী অধ্যাপক মো. আহসানুল হক।