১৪ জুন ২০২৬, ১২:৪০

প্রাথমিক শিক্ষায় ১ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী, ৬৫ হাজার স্কুল—চাপ সামাল দিতে নতুন উদ্যোগ

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন  © টিডিসি ফটো

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও সীমিত অবকাঠামোর চাপ সামাল দিতে নতুন করে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাখাতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিশাল। প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং মোট শিক্ষার্থী প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। এটি অত্যন্ত বড় একটি সেক্টর। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার ৫০০টি। প্রত্যেক স্কুলে ওয়াশরুম রয়েছে, তবে এ রুম উন্নত করার কাজ করছি।

আজ রবিবার (১৪ জুন) রাজধানীতে ইউনিসেফ আয়োজিত এক কর্মকশালায় এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এই লক্ষ্যেই প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি চান, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই এসব মূল্যবোধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে উঠুক।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা সবাই জানি, আমাদের দেশে স্কুলে ভর্তি হার তুলনামূলকভাবে কম এবং ড্রপআউটের হারও বেশি। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন স্কুল ড্রেস চালুর। এখন সব শিক্ষার্থী সমানভাবে স্কুল ইউনিফর্ম পাবে। আমরা শুরুতে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করব, যা জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টে শুরু হতে পারে। এর লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসতে আগ্রহী করা।

তিনি বলেন, একই সঙ্গে আগামী বাজেট থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে মিড-ডে মিল চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। যদিও খাবার সরবরাহে কিছু ত্রুটি আমরা পেয়েছি, কিন্তু আমরা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছি। যারা অনিয়ম করছে বা খারাপ, নষ্ট খাবার দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাখাতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিশাল। প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং মোট শিক্ষার্থী প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। এটি অত্যন্ত বড় একটি সেক্টর। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার ৫০০টি। প্রত্যেক স্কুলে ওয়াশরুম রয়েছে, তবে এ রুম উন্নত করার কাজ করছি।

আরও পড়ুন: ঢাবিতে ৬৪ জন আবেদন করলে একজন চান্স পায়, প্রাথমিকে এমন চাই না

এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষক নিয়োগে কিছু জটিলতা রয়েছে। বিচারাধীন মামলার কারণে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ আটকে আছে, যা এক-দুই দিনের বিষয় নয় এটি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৩ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার কারণে আমরা এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।

তিনি উল্লেখ করেন, ইন্টারিম সরকার ১৪ হাজার ৩০০ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে, যা খুব দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছিল। এতে মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাই আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে তাদের নিয়োগ দিচ্ছি, যেখানে দুই বছরের প্রোবেশন সময় রাখা হয়েছে। আরও প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষক সংকট রয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ে। আমি উচ্চ মাধ্যমিক বা অন্যান্য স্তরের কথা বলছি না, শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের কথাই বলছি। আমরা ভবিষ্যতে আমাদের কাজের ফলাফল নিজেরাই দেখব। আগামী চার বছর পর আমি এবং মন্ত্রী ববি হাজ্জাজ একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেখব আমরা কী অর্জন করতে পেরেছি।

‘বাজেটের ক্ষেত্রে আগে জিডিপির মাত্র ১.৬৯ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল, যার মধ্যে আইসিটি ও অন্যান্য খাতও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার প্রায় ২ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছে, যা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা (সংখ্যাগতভাবে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী)। প্রাথমিক শিক্ষাখাতে আগে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, এখন তা বেড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক খাতে আগে ৩১ হাজার কোটি টাকা ছিল, এখন তা বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। একইভাবে উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৪৬ হাজার কোটি থেকে বেড়ে ৫৭ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামী চার বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হবে। বাজেট সময় আমি নিজেই ভাবছিলাম, এই বিশাল বাজেট কীভাবে ব্যয় করব তাই আমি অতিরিক্ত কিছু চাইনি, বরং বাস্তবসম্মত বাজেটের ওপর জোর দিয়েছি।

তিনি বলেন, আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম এবং লার্নিং আউটকাম নিয়ে কথা বলেছেন। এটি আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের লার্নিং আউটকাম এখনো সন্তোষজনক নয়। আগামী দিনে আমরা গত চার বছরের অর্জনগুলো মূল্যায়ন করব। আমরা সবাই সমস্যাগুলো জানি এবং সেগুলো সমাধানে কাজ করছি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

‘বাল্যবিবাহ এখনো চলছে, তবে তা অনেকটাই গোপনে। সরকার এখন এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ১৮ বছরের নিচে বিয়ে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ এবং কেউ করলে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে বলা হলেও, বাস্তবে গ্রামাঞ্চলে আমি দেখেছি মেয়েরা ছেলেদের চেয়েও বেশি স্কুলে যাচ্ছে। এই অগ্রগতি শুরু হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়, যখন তিনি ‘ফুড ফর এডুকেশন’ চালু করেন। পরে এটি টাকা ও স্টাইপেন্ডে রূপান্তর করা হয়।’

তিনি মেয়েদের জন্য স্টাইপেন্ড চালু করেছিলেন, যার ফলে মেয়েরা শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশি যুক্ত হয়েছে। পরবর্তীতে এটি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয় এবং এখন ধীরে ধীরে ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এটি ছেলে-মেয়েসহ সবার জন্যই চালু হবে। আমাদের সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ আমাদের দেশ জনবহুল, তাই এই জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তর করা জরুরি।

শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষাতেও কারিগরি শিক্ষা যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে এটি আরও কার্যকর হয়। মাধ্যমিক শিক্ষায় আমরা আরও স্কুল, কলেজ এবং ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করার পরিকল্পনা নিয়েছি। ৬৭০টি নতুন স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে, যা একটি বড় উদ্যোগ এ ধরনের বড় কর্মসূচি আগে কোনো সরকার নেয়নি। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিল্প ও একাডেমিক সংযোগ এখনো দুর্বল, এটি উন্নত করার কাজ চলছে। দক্ষতা উন্নয়নেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি সংসদীয় আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও আলোচনা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দরকার। তাই আমরা এখন গ্রাম পর্যায়ে ম্যাপিং করছি, যাতে কোনো গ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়বিহীন না থাকে। আমাদের লক্ষ্য হলো দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানো। সময় খুব বেশি নেই প্রায় ২০৪১ সাল পর্যন্ত আমাদের হাতে সময় আছে। এই সময়ের মধ্যেই আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিশেষ করে শিক্ষা খাতে।

সবশেষে তিনি বলেন, সরকার শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমি যদি প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি তার দ্বিতীয় বা তৃতীয় অগ্রাধিকার কী, তিনি বলবেন শুধু শিক্ষা। আমরা একটি শিক্ষিত ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চাই। ‘আগামী বাংলাদেশ’ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি।