০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:২২

জ্বালানি সাশ্রয়ে অনলাইন ক্লাসের উদ্যোগ, শঙ্কার কথা বলছেন চাকরিজীবী বাবা-মা

জ্বালানি সাশ্রয়ে অনলাইন ক্লাস চালুর কথা ভাবছে সরকার  © টিডিসি সম্পাদিত

ইরান যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানাবিধ সংকটে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাসের সমন্বয়ে নতুন পদ্ধতি চালুর চিন্তা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ব্যবস্থাকে এক পক্ষ স্বাগত জানালেও আরেক পক্ষ বলছে, এতে তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে চাকরিজীবী ও কর্মজীবী বাবা-মা ভোগান্তির শিকার হবেন বলে মনে করছেন। কোমলমতি শিশুদের ক্লাস ও ডিভাইস আসক্তির কথাও সামনে আসছে। এ পরিস্থিতিতে তারাও অনলাইনে ক্লাসের সময়ে হোম অফিস দেওয়ার কথা বিবেচনার অনুরোধ করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, জোড়-বিজোড় দিনের ভিত্তিতে ক্লাস নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ঘনিষ্ট একটি সূত্র দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সূত্রটি জানায়, বিষয়টি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।

আগেই কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমন প্রশ্ন করে চাকরিজীবী ইফফাত সোমা বলেন, ‘তিন দিন অনলাইন ক্লাস না করে ৩ দিন হোম অফিস করেন। বুঝলাম না প্রাইমারি, সেকেন্ডারির শিশুরা অনলাইনে কি ক্লাস করবে? আর মা-বাপ অফিসে থাকলে এরা অনলাইনে বসবে? কেমন করে? তার মানে এদের হাতে মোবাইল ফোন দিয়ে যেতে হবে। আর ইন্টারনেট এক্সেসসহ মোবাইল হাতে পেয়ে এরা অনলাইনে ক্লাস করবে? আমার বাচ্চা তো করবে না। এসব হাইব্রিড বুদ্ধি কার মাথা থেকে বের হয়?’

দুই সন্তানের বাবা বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ বলেন, বড় সন্তানের জন্য অনলাইন ক্লাস ঠিক হলেও যারা ছোট, নিচের ক্লাসে পড়ে- তারা কীভাবে অনলাইনে ক্লাস করবে? তাদের তো পরে ডিভাইস আসক্তির শঙ্কা বাড়বে। চাকরিজীবীদের সন্তানের কাছে মোবাইল ফোন রেখে যাওয়া লাগবে। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে তিন দিন ক্লাস নিয়ে বাকি তিনদিনের জন্য বেশি বেশি হোমওয়ার্ক দেওয়া যেতে পারে।

এমন খবর সামনে আসার পর কয়েকজন চাকরিজীবী অভিভাবক বলছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি সিদ্ধান্ত আমাদের অবশ্যই মানতে হবে। তবে যাদের বাবা-মা কিংবা যেকোনো একজন চাকরিজীবী বা কর্মজীবী, তাদের জন্য এ উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ বাবা-মা অফিসে আর সন্তান বাসায় থাকলে তারা ক্লাসে কতটুকু মনোযোগী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আবার অনেকে ‘দুষ্টুমি’ করতে পারে।

‘তিন দিন অনলাইন ক্লাস না করে ৩ দিন হোম অফিস করেন। বুঝলাম না প্রাইমারি, সেকেন্ডারির শিশুরা অনলাইনে কি ক্লাস করবে? আর মা-বাপ অফিসে থাকলে এরা অনলাইনে বসবে? কেমন করে? তার মানে এদের হাতে মোবাইল ফোন দিয়ে যেতে হবে। আর ইন্টারনেট এক্সেসসহ মোবাইল হাতে পেয়ে এরা অনলাইনে ক্লাস করবে? আমার বাচ্চা তো করবে না। এসব হাইব্রিড বুদ্ধি কার মাথা থেকে বের হয়?’ -চাকরিজীবী ইফফাত সোমা

যদিও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে অভিভাবক সমাজ। সংগঠনের সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, জ্বালানি সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ সময়োপযোগী। সামনাসামনি ক্লাসের তুলনায় অনলাইনে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ রাখার চেয়ে অনলাইনে চালু রাখা অনেক কার্যকর ও বাস্তবসম্মত।

অনলাইন ক্লাসের দিনগুলোয় সন্তানের বাসায় রাখা কতটা নিরাপদ, তা নিয়েও সংশয়ে আছেন অনেকে। তাদের ভাষ্য, বাসায় দেখভালের কেউ না থাকলে সন্তানকে একা রাখাটা অনিরাপদ। স্কুলের সময় অনেক ক্ষেত্রে চাকরির সময়ের মতোই হওয়ায় তারা অনেকটা নিরুদ্বেগ থাকেন। কিন্তু সরকারের এমন উদ্বেগ বাস্তবায়ন হলে তারা পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবেন, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন।

আবু হানিফ নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘ক্লাসে সামনে বসিয়েই অনেক শিক্ষার্থীকে শেখানো যায় না। আর অনলাইনে ক্লাস রেখে গেমস খেলবে। অনলাইনে ক্লাস একমাত্র মেধাবী পরিশ্রমী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য।’ তবে রেদোয়ানুল ইসলামের ভাষ্য, ‘সপ্তাহে তিন দিন অফলাইনে ক্লাস, বাকি দুইদিন অনলাইনে ক্লাস, সেক্ষেত্রে দেশের জ্বালানি খরচ কম হবে এবং দেশ উন্নয়নের পথে থাকবে। ছাত্র-ছাত্রীরা স্মার্ট হবে, স্মার্ট শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় উন্নত হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থায় জোড় তারিখে অনলাইন ক্লাস এবং বিজোড় তারিখে অফলাইন ক্লাস পরিচালিত হতে পারে। তবে ব্যবহারিক বা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসগুলো কেবল অফলাইনেই নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে একমত হয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটাতে এ ধরনের হাইব্রিড পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। তবে বাস্তবায়নের আগে আরও পর্যালোচনা করা হবে।

‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫ দিনের পরিবর্তে ৬ দিন ক্লাস এবং অফলাইনের সঙ্গে অনলাইন ক্লাসের চিন্তা— আপনি কি এই ভাবনা সঠিক মনে করেন?’ এমন প্রশ্নে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের ওয়েবসাইটে একটি জরিপ করা হয়েছে। এতে ৫৪৬ জন ভোট দিয়েছেন। তারমধ্যে ৩৪ শতাংশ এর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। আর ৬৪ শতাংশ না ভোট দিয়েছেন। মতামত দেননি ২ শতাংশ।

কয়েকজন অভিভাবক বলছেন, চাকরিজীবী ও কর্মজীবী বাবা-মায়ের কথা বিবেচনা করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনদিন অনলাইন ক্লাস হলে সে দিনগুলো হোম অফিসের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিংবা সবার জন্য সুবিধাজনক হয়, এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কিনা, তাও ভেবে দেখতে হবে।

আল আমিন নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘ছয় দিন ক্লাস খোলা থাকল, অথচ কোনো শিক্ষার্থী আসলো না। তাতে শিক্ষকদের ভোগান্তি হলো। এর চেয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আর নিয়মিত পড়ালেখা করলে ৫ দিনেই অনেক কিছু শেখানো সম্ভব।’

‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫ দিনের পরিবর্তে ৬ দিন ক্লাস এবং অফলাইনের সঙ্গে অনলাইন ক্লাসের চিন্তা— আপনি কি এই ভাবনা সঠিক মনে করেন?’ এমন প্রশ্নে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের ওয়েবসাইটে একটি জরিপ করা হয়েছে। এতে ৫৪৬ জন ভোট দিয়েছেন। তারমধ্যে ৩৪ শতাংশ এর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। আর ৬৪ শতাংশ না ভোট দিয়েছেন। মতামত দেননি ২ শতাংশ।

আজিজুল ইসলাম আসিফ ‘প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ কি শিক্ষা গ্রহণ করবে না ?’ এমন প্রশ্ন করে বলেন, ‘এসব নিয়মে কোনো ফায়দা হবে না। অনলাইন ক্লাসের এ ভিমরতিতে গ্রামাঞ্চলের হাজারও বাচ্চা মোবাইল গেমে আসক্ত, তাদের পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছে। আবারও যদি এসব শুরু হয়, বাকিটুকুও বিলীন হবে।’

এমন সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, ‘আমরা যখন বাসায় থাকব না, অফিসে থাক- তখন আমাদের সন্তান বাসায় ঠিকমতো অনলাইন ক্লাসে মনোযোগী হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় আছে। তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ থাকবে। সে ক্ষেত্রে এ দিনগুলোয় হোম অফিসের কথা চিন্তা করা যেতে পারে। এতে তারাও ক্লাসে মনোযোগী হবে, আমরাও আমাদের কাজ গুছিয়ে নিতে পারব।’

জানা গেছে, চলমান বৈশ্বিক সংকটে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সাপ্তাহিক ছুটি তিন দিন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস নেওয়াসহ আটটি পরিকল্পনা করেছে সরকার। এসব পরিকল্পনার মধ্যে কোনটি বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়ে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভায় চূড়ান্ত করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের সাপ্তাহিক ছুটি একদিন বাড়িয়ে তিনদিন করার পরিকল্পনা করা হয়েছ। সাপ্তাহিক ছুুটি না কমানো হলে বাসায় বসে (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) কাজ করার সুযোগ অথবা অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে। ঘরে বসে কাজ করার সিদ্ধান্ত হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সপ্তাহে দুদিন এ সুযোগ পাবেন। এছাড়া স্কুলগুলোতে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনাও করা হয়েছে। তবে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কোনো পরিকল্পনা এখনো করা হয়নি।

আরও পড়ুন: পে-স্কেলের বাস্তবায়ন দাবিতে ৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা সরকারি কর্মচারীদের

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জ্বালানি সাশ্রয়ে কমপক্ষে আটটি পদক্ষেপ আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়তি একদিন যোগ করা অথবা কর্মকর্তাদের সপ্তাহে দুদিন ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। অফিসের কাজ দ্রুত শুরু করা অথবা কাজের মোট সময় কমিয়ে আনার প্রস্তাবও রয়েছে। বিদ্যুৎ খরচ কমাতে সপ্তাহের অর্ধেক ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।’

জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের ৫৫ শতাংশ মানুষ অনলাইনে ক্লাস চাচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, ‘আমি ইতিমধ্যে পরিসংখ্যান করেছি ৫৫ শতাংশ মানুষ চাচ্ছে যেন অনলাইনে ক্লাস যায়। তবে সম্পূর্ণ অনলাইনে যদি যাই, তাহলে আমরা আবার অসামাজিক হয়ে যাব।’

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের মহানগরীর স্কুলগুলোতে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাসের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্কুলগুলোতে অনলাইন এবং অফলাইন দুইভাবেই ক্লাস নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এজন্য সপ্তাহে ৬ দিন পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হতে পারে।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সব ধরনের বাংলা-ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলো অনলাইন এবং অফলাইন মুডে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছি। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদের সভায় আমরা আমাদের পরিকল্পনা উত্থাপন করব। এর পর যে সিদ্ধান্ত হয়, সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।’