২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৩৬

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির চেয়ারে আবারও রাজনীতিবিদদের বসানোর প্রস্তাব, চটেছেন শিক্ষকরা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি  © এআই ছবি

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগ বন্ধে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর পরিবর্তে এসব পদে সরকারি কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের দায়িত্ব দেওয়ার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা ফিরতে শুরু করে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সম্প্রতি আবারও ওই পদে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি তুলেছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। জোটটির শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। যিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদ সদস্য। গত রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জোটের শতাধিক নেতাকর্মী শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকে তারা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে পুনরায় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগের দাবি জানান। পাশাপাশি, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যেন অন্তত তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন, এমন প্রস্তাবও উত্থাপন করা হয়। এ দাবিকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং শিক্ষাবিদদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পদটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। তাদের মতে, অতীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্যসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সভাপতির দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জড়িত ছিলেন।

শিক্ষকদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক অস্থিরতাও বেড়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে তারা শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

‘গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে ম্যানেজিং কমিটি থেকে রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবির প্রেক্ষিতেই অন্তর্বর্তী সরকার এই পদটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সম্প্রতি একটি চক্র মীমাংসিত একটি বিষয় নিয়ে জলঘোলা করছে। তারা ফ্যাসিস্ট আমলের নিয়মে ফিরে গিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজিং কমিটিতে রাখার দাবি জানাচ্ছে। জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট এর তীব্র বিরোধিতা করে।’-অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী 

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সভাপতি পদে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সহজ হচ্ছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগের নিয়মে রাজনৈতিক নেতাদের পুনর্বহাল করা হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির ঝুঁকি আবারও বাড়তে পারে। যদিও শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের নেতারা দাবি করছেন, জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা থাকলে স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গতিশীলতা বাড়ে এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন সহজ হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে আমরা কয়েক দফা বৈঠক করেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি থেকে রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবির প্রেক্ষিতেই অন্তর্বর্তী সরকার এই পদটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সম্প্রতি একটি চক্র মীমাংসিত একটি বিষয় নিয়ে জলঘোলা করছে। তারা ফ্যাসিস্ট আমলের নিয়মে ফিরে গিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজিং কমিটিতে রাখার দাবি জানাচ্ছে। জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট এর তীব্র বিরোধীতা করে।’

‘বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো ফ্রি স্টাইলে চলছে। রাজনৈতিক নেতারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ যেভাবে খুশি সেভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবেন না। এছাড়া একটি উপজেলায় ২৫ থেকে ৩০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একজন এমপি তিনটি প্রতিষ্ঠানে থাকলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও নজরদারিতে থাকবে।’-অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া

ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের রাখা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারও নিয়োগ বাণিজ্য শুরু হবে জানিয়ে এ শিক্ষক নেতা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বাতিল হলে ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক তা মেনে নেবে না। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি শিক্ষকদের আস্থা রয়েছে। শিক্ষকরা বিশ্বাস করে শিক্ষামন্ত্রী অন্যায় কোনো দাবি মেনে নেবেন না। যদি শিক্ষামন্ত্রী তাদের দাবি মেনে নেয়, তাহলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেবে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোট।’

আরও পড়ুন: জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ আজ, দেখবেন যেভাবে

জানতে চাইলে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো ফ্রি স্টাইলে চলছে। এটি বন্ধে ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের থাকা জরুরি। রাজনৈতিক নেতারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ যেভাবে খুশি সেভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবেন না। এছাড়া একটি উপজেলায় ২৫ থেকে ৩০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একজন এমপি তিনটি প্রতিষ্ঠানে থাকলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও নজরদারিতে থাকবে।’

শিক্ষকদের বড় অংশ রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজিং কমিটিতে চাচ্ছেন না। আপনারা কেন চাচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘ফেসবুকে অনেকে অনেক কিছু বলে। ফেসবুকের জরিপ বিশ্বাসযোগ্য নয়। ফেসবুকের কারণেই শিক্ষা ধ্বংস হয়ে গেছে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের রাখা না রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা বিষয়গুলো পর্যালোচনা করব। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাদের জানিয়ে দেব।’