সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফেরত দিতে হবে ১১৬ কোটি টাকা
নীতিমালার বাইরে গিয়ে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া বাড়তি দুই উৎসাহ বোনাসের প্রায় ১১৬ কোটি টাকা ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য সর্বোচ্চ তিনটি বোনাস দেওয়ার সুযোগ থাকলেও ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি করে বোনাস দেওয়া হয়েছিল।
দেড় বছর আগে অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনো তা আদায় করতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
নতুন করে গত ১১ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে (সিইও) দেওয়া চিঠিতে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে অসম্মতি জানিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। একই সঙ্গে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঁচটি করে উৎসাহ বোনাস পেয়েছেন। প্রতিটি বোনাসের অর্থ মূলত এক মাসের মূল বেতনের সমান। ব্যাংকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, একটি বোনাসে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সে হিসাবে বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চও বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ফেরত নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তবে দেড় বছরেও সেই অর্থ আদায় করা হয়নি।
সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও শওকত আলী খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘৫ বোনাসের সিদ্ধান্তটি আমি এ ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছে। যেকোনোভাবেই হোক, টাকা যেহেতু পরিশোধ করা হয়ে গেছে, সেহেতু আমরা সরকারকে তা মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। নতুন করে আবার একই অনুরোধ জানাব।’
যেভাবে দেওয়া হয়েছিল পাঁচ বোনাস
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরের দিনগুলোতে সোনালী ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঁচটি উৎসাহ বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করেন। ৭ আগস্ট তারা ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ও সিইও আফজাল করিমকে অবরুদ্ধ করেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, বছরে তিনটির বেশি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না। এরপরও বোনাসের দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকলে ২০ আগস্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী।
এর আগে তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ নীতিমালার বাইরে গিয়ে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করে। এ নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তি ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে সম্মতি দেয়নি।
পরবর্তী সময়ে সোনালী ব্যাংক পাঁচটি বোনাস দেওয়ার অনুমোদন চেয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমা চায়। তবে নিজেদের করা নীতিমালা লঙ্ঘন করে পাঁচটি বোনাস অনুমোদন করেনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও আপত্তি
সোনালী ব্যাংকের বোনাসের বিষয়টি নিয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে দেওয়া চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ২০২৩ সালের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস বাবদ ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে ব্যাংকটি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জন্য ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান রাখা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানায়, সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব উৎসাহ বোনাস নীতিমালাতেও তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৮৭০তম পর্ষদ বৈঠকে পাঁচটি বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
ওই অনুমোদন ছিল শর্তসাপেক্ষ। ভবিষ্যতে কোনো নিরীক্ষা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে আপত্তি উঠলে বাড়তি টাকা ফেরত দিতে হবে এবং এ বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
নতুন নীতিমালায় সর্বোচ্চ তিন বোনাস
সোনালী ব্যাংক ছাড়াও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীনসহ সরকারি অন্য ব্যাংকগুলোতে ঢালাওভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার প্রবণতা ছিল। এ কারণে ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর উৎসাহ বোনাস নিয়ে নতুন নির্দেশিকা জারি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
আরও দেখুুন: মাগুরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ৬ পদে চাকরি, আবেদন ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত
নতুন নির্দেশিকায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক, অ-তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সূচকে মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সোনালী, অগ্রণীসহ ছয়টি রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বোনাস দেওয়ার আগে পাঁচটি সূচক মূল্যায়ন করতে হবে। এগুলো হলো—চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায়ের হার এবং অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার।
এর মধ্যে চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই সূচকে ৫০-এর বেশি নম্বর রয়েছে। মোট নম্বরের ভিত্তিতে বোনাসের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। সর্বোচ্চ তিনটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া যাবে। নম্বর কম হলে বোনাসের সংখ্যাও কমবে। আর নম্বর খুব কম হলে কোনো বোনাস দেওয়া হবে না।
নতুন নির্দেশনায় উৎসাহ বোনাসের পরিমাণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর না করে ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।