১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৩২

বাংলা কিউআরে পিটুপি লেনদেন চালুর উদ্যোগ নিল বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলা কিউআর  © টিডিসি সম্পাদিত

ক্যাশ বা নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়াতে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পিটুপি) লেনদেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুবিধা চালুর জন্য আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে নিজস্ব অ্যাপে প্রয়োজনীয় ফিচার যুক্ত করতে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) ও পেমেন্ট সার্ভিস অপারেটরদের (পিএসও) নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত বৃহস্পতিবার জারি করা এক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের অ্যাপে পিটুপি লেনদেনের জন্য নির্দিষ্ট কিউআর কোড তৈরি এবং অন্যের পাঠানো পিটুপি কিউআর কোড স্ক্যান বা আপলোড করার সুবিধা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সুবিধা চালুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এর আগে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে নিজস্ব অ্যাপে পিটুপি কিউআর তৈরি এবং অন্যের পাঠানো কিউআর স্ক্যান বা আপলোডের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের পরিচালক শরফত উল্লাহ খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা বাংলা কিউআরকে একটি একক ও সর্বজনীন কিউআর কোডে রূপান্তরের জন্য সার্বিক পদক্ষেপ নেব। ইতিমধ্যে মার্চেন্ট পেমেন্টের চার্জ শূন্য করা হয়েছে, যা ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিদিন বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। আগামী অক্টোবরের শুরু থেকে এর লেনদেনের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।’ বাজারের চাহিদার আলোকে আরও নতুন নতুন সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেনের সুবিধা চালু হলে অনলাইন লেনদেন ব্যাপকভাবে বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘এখন কেউ সেন্ড মানি করতে গিয়ে একটি সংখ্যা ভুল করলে টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একক কিউআর কোড চালু হলে সেই আশঙ্কা আর থাকবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন গ্রাহক তার কিউআরের মাধ্যমে ব্যাংক কিংবা এমএফএস ব্যবহার করে কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই লেনদেন করতে পারবেন। ফলে নতুন করে গ্রাহকের নাম বা বিভিন্ন তথ্য এন্ট্রি করার প্রয়োজন হবে না।’

এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে করা যায় কি না, তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব সেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র।

যেভাবে কাজ করবে পিটুপি লেনদেন
বর্তমানে বাংলা কিউআর মূলত মার্চেন্ট পেমেন্টে ব্যবহৃত হয়। কোনো দোকান থেকে পণ্য কেনার পর দোকানদার বাংলা কিউআর দেখালে গ্রাহক ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপের মাধ্যমে সেটি স্ক্যান করে টাকা পরিশোধ করেন। অর্থাৎ, বর্তমান ব্যবস্থায় লেনদেনটি কাস্টমার থেকে মার্চেন্ট (সিটুএম) ভিত্তিতে হয়ে থাকে।

নতুন ব্যবস্থায় একই কিউআর প্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন ব্যক্তি আরেকজনকে টাকা পাঠাতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে, ঢাকা থেকে কোনো বাবা তার সন্তানের কাছে টাকা পাঠাতে চাইলে সন্তান নিজের অ্যাপ থেকে একটি পিটুপি বাংলা কিউআর তৈরি করে বাবাকে পাঠাতে পারবেন। বাবা সেই কিউআর স্ক্যান করে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠিয়ে দিতে পারবেন।

এর ফলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, রাউটিং নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য হাতে লিখে দেওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে।

আরও দেখুন: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী

এ ধরনের লেনদেনে আলাদা কোনো চার্জ বা মাশুলের নিয়ম থাকবে না। ব্যাংক থেকে ব্যাংক স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আইবিএফটির নির্ধারিত চার্জ এবং ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপির আন্তঃলেনদেনে আগে নির্ধারিত হারেই চার্জ কাটা হবে।

মার্চেন্ট পেমেন্টে শূন্য চার্জ
ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়াতে বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক সব লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিমবার্সমেন্ট ফি বা আন্তঃব্যাংক চার্জ শূন্য করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে কোনো লেনদেনে কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্টের পেমেন্ট গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ বাবদ কোনো ফি বা সার্ভিস চার্জ নিতে পারবে না সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলা কিউআর ব্যবহারে ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের উৎসাহিত করতে ১০০ কোটি টাকার একটি প্রণোদনা তহবিলও গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রয়োজন হলে এ তহবিলের আকার আরও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

গত ৮ আগস্ট চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলের নীলগিরি হলে আয়োজিত বাংলা কিউআর লেনদেন বিষয়ক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের অন্যতম বড় বাধা স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার। দেশে এখনো প্রায় ছয় কোটি মানুষ বাটন ফোন ব্যবহার করেন। তাদের ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনতে স্বল্পমূল্যে অ্যান্ড্রয়েড ফোন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বাটন ফোন ব্যবহারকারীরা ভালো একটি ফোনের জন্য প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে আগ্রহী। অন্যদিকে নির্মাতারা জানিয়েছেন, ৮ হাজার টাকার নিচে অ্যান্ড্রয়েড ফোন দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে প্রায় ৫ হাজার টাকার যে ব্যবধান রয়েছে, তা পূরণ করতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।’

এই বিনিয়োগের ব্যবস্থা কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘মোবাইল ফোন কিস্তিতে কেনার সুযোগ তৈরির বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্যোগ নিয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে কিস্তিতে অ্যান্ড্রয়েড ফোন দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা গেলে বিপুলসংখ্যক বাটন ফোন ব্যবহারকারীকে ডিজিটাল ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা সম্ভব হবে।’

ছয় মাসে বাংলা কিউআরের লেনদেন বেড়েছে ৮.৬ গুণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বাংলা কিউআর ব্যবহারে দ্রুত গতি এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এ ব্যবস্থায় ৭ লাখ ২৩ হাজার ৩৭৮টি লেনদেন হয়। এসব লেনদেনের মোট মূল্য ছিল ২১২ কোটি ৫ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন: ৭ লাখ ৫৬ হাজার ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বন্ধ করল মেটা

জুলাইয়ে লেনদেনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৩৮টিতে। একই সময়ে লেনদেনের মোট মূল্য বেড়ে হয় ১ হাজার ৪৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ৮.৬ গুণ এবং মোট লেনদেনের মূল্য প্রায় সাত গুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য আরও বলছে, বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্টের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে বাংলা কিউআর মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৭১২। জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৮৮ এবং জুলাইয়ে আরও বেড়ে ২৪ লাখ ২৫ হাজার ১৩৩-তে পৌঁছায়।

অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে বাংলা কিউআর মার্চেন্টের সংখ্যা প্রায় ৭৯ শতাংশ এবং গত ১০ মাসে প্রায় ৯৩ শতাংশ বেড়েছে।

কর্মশালায় প্রশিক্ষক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-১ এর অতিরিক্ত পরিচালক মো. পারওয়েজ আনজাম মুনির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। টাকা ছাপানো, সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে উৎপাদন, মানুষের হাতে পৌঁছানো, ব্যবহার, নোট নষ্ট ও ছেঁড়াফাটা হওয়ার পর সংগ্রহ এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করা পুরো প্রক্রিয়ায় এ বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা টাকা ছাপাই, সেটি মানুষের কাছে যায়, মানুষ ব্যবহার করে, নোট নোংরা ও ছেঁড়াফাটা হয়ে যায়। এরপর সেটি আবার সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। আমরা তো গরিব দেশ। শুধু নগদ নোটের পেছনে এত টাকা ব্যয় করা আসলে চরম বিলাসিতা ও অপচয়।’

তার মতে, নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার ঘটানো গেলে এ বিশাল ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। ডিজিটাল লেনদেনে খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় যাওয়া জরুরি।