এমপিওভুক্ত শিক্ষক: বেড়েছে বেতন, কমেনি ছয় বৈষম্য
বেতন বেড়েছে ধাপে ধাপে, সরকারি অর্থায়নও পৌঁছেছে শতভাগে। তবু বৈষম্য কমেনি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের। মূল বেতন সরকারি কোষাগার থেকে শতভাগ পেলেও বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা, শিক্ষা, শ্রান্তি-বিনোদন এবং অবসর-সুবিধায় সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় বেশ বৈষম্য রয়েছে। কয়েক দশকের আন্দোলনেও এসব বৈষম্য পুরোপুরি না কাটায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ বয়ে বেড়াচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।
৫ টাকা থেকে সরকারি বেতনের শতভাগ
বেসরকারি শিক্ষকদের সরকারি সহায়তার ইতিহাস স্বাধীনতারও আগে থেকে শুরু। পাকিস্তান আমলে বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি কোষাগার থেকে মাসিক মাত্র ৫ টাকা ‘মহার্ঘ ভাতা’ পেতেন। ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে শিক্ষক আন্দোলনের পর মাধ্যমিকের শিক্ষকদের ভাতা ১৫ টাকা এবং কলেজ শিক্ষকদের ২০ টাকা করা হয়।
ষাটের দশকে কলেজশিক্ষকেরা মাসিক ৩০ টাকা এবং মাধ্যমিকের শিক্ষকেরা ২০ টাকা সরকারি অনুদান পেতেন। স্বাধীনতার পর এই অনুদান কিছুটা বাড়িয়ে কলেজশিক্ষকদের ৫০ টাকা এবং স্কুলশিক্ষকদের ৩০ টাকা করা হয়। ১৯৭৭ সালে আর্থিক সুবিধা আরও বাড়ানো হয়। সে সময় কলেজের অধ্যাপকেরা ২০০ টাকা এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষকেরা ১১০ টাকা ভাতা পেতে শুরু করেন।
বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য বড় পরিবর্তন আসে ১৯৮০ সালে। ওই সময় প্রথমবারের মতো বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় আনা হয় এবং তাঁদের বেতনের ৫০ শতাংশ সরকারি তহবিল থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
বেসরকারি শিক্ষকদের সরকারি সহায়তার ইতিহাস স্বাধীনতারও আগে থেকে শুরু। পাকিস্তান আমলে বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি কোষাগার থেকে মাসিক মাত্র ৫ টাকা ‘মহার্ঘ ভাতা’ পেতেন। ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে শিক্ষক আন্দোলনের পর মাধ্যমিকের শিক্ষকদের ভাতা ১৫ টাকা এবং কলেজ শিক্ষকদের ২০ টাকা করা হয়।
এরপরও আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সরকারি অংশ ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। ১৯৮২ সালে ১৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা চালু হয়, যা পরের বছর শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। ১৯৮৪ সালে সরকারি অংশ সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির ওপর শিক্ষকদের আর্থিক নির্ভরতা কমে এবং চাকরির নিরাপত্তা কিছুটা বাড়ে।
১৯৮৬ সালে চিকিৎসা ভাতা ৬০ টাকা থেকে ১০০ টাকা করা হয়। একই সময়ে সরকারি বেতনের অংশ ৭০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণে ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
আন্দোলনেই এসেছে একের পর এক সুবিধা
নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি শিক্ষকদের আন্দোলন আরও জোরালো হয়। ১৯৯৪ সালে শতভাগ বেতন দাবিতে আন্দোলনের পর চিকিৎসা ভাতা ১৫০ টাকা করা এবং টাইম স্কেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯৫ সালে সরকারি বেতনের অংশ ৮০ শতাংশে উন্নীত করা হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সময়ে শিক্ষকদের নামে ইনডেক্স ব্যবস্থা চালু করে তাঁদের ব্যাংক হিসাবে সরকারি অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষক নেতাদের ভাষ্য, ওই সময়ের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সরকারি বেতনের অংশ ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়।
২০০৬ সালে আসে আরেকটি বড় পরিবর্তন। দীর্ঘ আন্দোলনের পর বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি বেতনের অংশ ১০০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের সম্পূর্ণ অংশ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর হয়। ওই সময় শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ওসমান ফারুক।
মূল বেতনের সরকারি অংশ ৫০ শতাংশ থেকে ৬০, ৭০, ৮০ ও ৯০ শতাংশ হয়ে ২০০৬ সালে শতভাগে পৌঁছানোর এই ইতিহাসই দেখায় বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধার বড় পরিবর্তনগুলো এসেছে মূলত আন্দোলন ও সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মধ্য দিয়ে।
বেতন শতভাগ, ভাতায় বৈষম্য
শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, মূল বেতনের শতভাগ সরকারি অর্থায়ন হলেও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি শিক্ষকদের সঙ্গে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের সভাপতি অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বর্তমানে বাড়িভাড়া হিসেবে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ পান। অন্যদিকে সরকারি শিক্ষকরা এলাকাভেদে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া পান।
তিনি বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মেডিকেল ভাতা হিসেবে ৫০০ টাকা পান। অন্যদিকে সরকারি শিক্ষকরা বর্তমানে ১ হাজার ৫০০ টাকা মেডিকেল ভাতা পাচ্ছেন এবং নবম পে-স্কেল অনুযায়ী তা ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শিক্ষা ভাতা ও শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা দেওয়া হয় না। সরকারি শিক্ষকরা এসব ভাতাসহ আরও বিভিন্ন ধরনের ভাতা পান। এই শিক্ষক নেতা আক্ষেপ করে বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু নেই, যেখানে সরকারি শিক্ষকদের পেনশনের ব্যবস্থা রয়েছে।
অর্থাৎ মূল বেতন শতভাগ সরকার বহন করলেও বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা, শিক্ষা, শ্রান্তি-বিনোদন এবং অবসর-সুবিধায় সমতা এখনো আসেনি বলে শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ।
২০১২ থেকে ভাতা বৃদ্ধির দাবি
২০১২-১৩ সালে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বাড়ানো হয়। ২০১৫ সালে তাঁরা অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় আসেন। ২০১৬ সালে বাড়িভাড়া ভাতা ১ হাজার টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা করা হয়।
শিক্ষক নেতাদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় এসব সুবিধা এখনো অপ্রতুল। তাঁদের বক্তব্য, সময়ের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার কাঠামো পরিবর্তিত হলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা মূল বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হয়নি।
শিক্ষক নেতারা বলেন, বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর ইতিহাসে মূল বেতন নিয়ে একাধিকবার বড় পরিবর্তন এলেও ভাতাগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। ফলে মূল বেতন শতভাগ সরকারি হওয়ার পরও সামগ্রিক আর্থিক বৈষম্য রয়ে গেছে।
এদিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য মাসিক বাড়িভাড়া ভাতা ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে প্রত্যাশার তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন শিক্ষক নেতারা।
তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ হারে নির্ধারণ করা হোক। রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষক-কর্মচারীদের তিন দফার অন্যতম দাবিই ছিল মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা বৃদ্ধি।
এখানে সময়ের একটি পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে মূল বেতনের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, যার ন্যূনতম পরিমাণ ২ হাজার টাকা।
২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে আরও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ যোগ হয়ে মোট বাড়িভাড়া ১৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এখনও শিক্ষক নেতাদের দাবি, বাড়িভাড়া মূল বেতনের অন্তত ২০ শতাংশ হারে নির্ধারণ করতে হবে।
শিক্ষক নেতারা বলছেন, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার মতো মৌলিক সুবিধা নির্দিষ্ট অঙ্কে না রেখে মূল বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হারে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ নির্দিষ্ট অঙ্কে ভাতা নির্ধারণ করা হলে সময়ের সঙ্গে বেতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও ভাতার পরিমাণ একই থাকে।
এতে দীর্ঘমেয়াদে এসব সুবিধার প্রকৃত মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে মূল বেতন বাড়লেও ভাতা নির্দিষ্ট অঙ্কে অপরিবর্তিত থাকলে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হতে পারে।
জাতীয়করণের দাবিও জোরালো
শুধু বাড়িভাড়া বা উৎসব ভাতা নয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা পুরো শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিও জানিয়ে আসছেন। অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষায় বিদ্যমান সব বৈষম্য দূর করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর রিজার্ভ ফান্ড ও জেনারেল ফান্ডের সমুদয় অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের ঘোষণা দিতে হবে।
তাঁর দাবি, জাতীয়করণ করা হলে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে না। জাতীয়করণ বাস্তবায়নে সরকারের আর্থিক দায়, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও পরিচালনা কাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা বিবেচনায় জাতীয়করণের দাবি বাস্তবায়ন একটি বড় নীতিগত ও আর্থিক সিদ্ধান্ত বলেও মনে করেন তারা।
৫৪ বছরেও শেষ হয়নি বৈষম্য
শিক্ষক নেতাদের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ পরিচালিত হয়ে আসছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শিক্ষা ভাতা ও শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা দেওয়া হয় না। সরকারি শিক্ষকরা এসব ভাতাসহ আরও বিভিন্ন ধরনের ভাতা পান। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু নেই, যেখানে সরকারি শিক্ষকদের পেনশনের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ মূল বেতন শতভাগ সরকার বহন করলেও বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা, শিক্ষা, শ্রান্তি-বিনোদন এবং অবসর-সুবিধায় সমতা এখনো আসেনি’-অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী, সদস্য সচিব, এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট
বেসরকারি শিক্ষকদের সরকারি সহায়তার ইতিহাসও তাই দীর্ঘ। পাঁচ টাকা মহার্ঘ ভাতা থেকে শুরু করে ১৯৮০ সালে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, পরবর্তী সময়ে ৬০, ৭০, ৮০ ও ৯০ শতাংশ এবং ২০০৬ সালে শতভাগ সরকারি বেতন—প্রতিটি ধাপেই শিক্ষক আন্দোলনের ভূমিকা ছিল।
শিক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা এখনো সরকারি শিক্ষকদের সমান মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন না। এ কারণে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছে।
শিক্ষকদের ভাষ্য, আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁরা ধাপে ধাপে সরকারি বেতনের অংশ বাড়ানো, জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তি, ইনডেক্স ব্যবস্থা, অবসর ও কল্যাণ সুবিধাসহ বিভিন্ন অধিকার অর্জন করেছেন। ফলে এসব আন্দোলনও হঠাৎ তৈরি হয়নি; এর পেছনে কয়েক দশকের বঞ্চনা ও দাবি-দাওয়ার ইতিহাস রয়েছে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি
শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রেক্ষাপটে শিক্ষক অধিকার নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে এলেও বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষকদের দাবি বহু পুরোনো। ৫ টাকা মহার্ঘ ভাতা থেকে শতভাগ মূল বেতন পর্যন্ত পৌঁছাতে তাঁদের কয়েক দশকের আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু মূল বেতনের বাইরে অন্যান্য সুবিধায় বৈষম্যের অভিযোগ এখনো রয়ে গেছে।
শিক্ষকদের প্রত্যাশা, শিক্ষকতা যদি রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেশা হয়, তাহলে শিক্ষকদের জীবনযাপন ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও রাষ্ট্রীয় নীতিতে যথাযথ গুরুত্ব পেতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার ও জাতীয়করণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হোক।
আরও খবর: বাদ পড়া আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে ৪৯তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপন জারি
শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমদ বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষকদের বেতন কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে। তবে এর সুফল মূলত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পাবেন। অথচ দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষকের মাত্র ৩ শতাংশ সরকারি শিক্ষক। তারা সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেডের মধ্যে ১০ম গ্রেডের বেতন কাঠামোতে রয়েছেন।
অন্যদিকে মাধ্যমিকের ৯৭ শতাংশ শিক্ষক এমপিওভুক্ত। তারা সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় মূল বেতন এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশ সুবিধা পান। আর নন-এমপিও শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে বেতন পান, যা এর চেয়েও উল্লেখযোগ্যভাবে কম বলে মনে করেন তিনি।
শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, শিক্ষকতার ভূমিকা ও মর্যাদা শুধু বেতন-ভাতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে পেশাগত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি, দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়ও যুক্ত। বাংলাদেশে শিক্ষক ব্যবস্থাপনার এসব জায়গায় দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে। তাই শুধু নতুন প্রকল্প বা প্রশিক্ষণ নয়, শিক্ষকতা পেশাকে দীর্ঘমেয়াদে আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
তার মতে, শিক্ষকরা সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। তাই তাদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হলে তাদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ক্যারিয়ার পথ, সম্মানজনক বেতন-ভাতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের সংকটময় অবস্থা থেকেই যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের শিক্ষা ভাবনায় অনেক পরিবর্তনের আশ্বাস শোনা যাচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়ন হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।