দারুল ইহসানের ‘অবৈধ’ সনদ বৈধ করার উদ্যোগ, শিক্ষা প্রশাসনে সমালোচনার ঝড়
দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগে বন্ধ হওয়া সনদধারী শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) অবৈধ সনদকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামী রবিবার (৮ মার্চ) এমপিও আপিল কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে।
দারুলের অবৈধ সনদকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগে শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালতের রায়ের পর বন্ধ হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ আইনি ও নীতিগত প্রশ্ন উঠাচ্ছে।
মাউশি সূত্র জানায়, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ব্যবহার করে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাদের অনেকেই নানা প্রশাসনিক সমস্যায় পড়েছেন। এ সমস্যা সমাধানে মাউশি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
সূত্র বলছে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার বিএড সনদধারী রয়েছেন, ১০ হাজার শিক্ষক সপ্তম গ্রেডের বেতন প্রত্যাশী, ২০ হাজার শিক্ষক অষ্টম গ্রেডের বেতন প্রত্যাশী, এবং ১০ হাজার শিক্ষক উচ্চতর স্কেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। এছাড়া কয়েকশ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানও রয়েছেন যারা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের পর এমপিও সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। প্রায় ১০ হাজার গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকও উচ্চতর স্কেল পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় আছেন।
অবৈধ সনদকে বৈধতা দেওয়ার সুপারিশ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, ‘আমি কবে স্বাক্ষর করে চিঠি পাঠিয়েছি তা মনে নেই। কেন চিঠি দেওয়া হয়েছিল সেটিও জানি না। চিঠির অগ্রগতি জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করুন।’
মাউশি মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বি এম আব্দুল হান্নানের স্বাক্ষরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত সনদ দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা এমপিওভুক্তি, উচ্চতর স্কেল ও উচ্চতর পদে নিয়োগ সংক্রান্ত নানা জটিলতায় পড়ছেন। এসব সমস্যা সমাধানে মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল উচ্চ আদালত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে ২৫ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম ও আউটার ক্যাম্পাস বন্ধের নির্দেশ দেয়।
২০১৫ সালের ৩১ মে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) এক চিঠিতে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধানমন্ডি ক্যাম্পাস থেকে দেওয়া সনদের গ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হয়েছিল। ওই চিঠির ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর দারুল ইহসানসহ ছয়টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের বিষয়েও নির্দেশনা পাঠিয়েছে। এরপর ধানমন্ডি ক্যাম্পাস থেকে সনদপ্রাপ্ত কয়েকজনকে এমপিওভুক্ত করা হয়।
কিন্তু ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল উচ্চ আদালত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে ২৫ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম ও আউটার ক্যাম্পাস বন্ধের নির্দেশ দেয়। আদালতের রায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদগুলো সরাসরি বাতিল হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে মাউশির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আদালতের রায়ের আগে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ অর্জনকারী অনেকেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বা সহকারী গ্রন্থাগারিক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে তাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান করা যাচ্ছে না।
চিঠিতে নয় ধরনের জটিলতার উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক হিসেবে আগের এমপিওভুক্ত থাকার পর নতুন প্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত হতে না পারা, সহকারী শিক্ষক থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর এমপিও সুবিধা না পাওয়া, বিএড সনদ থাকার কারণে উচ্চতর গ্রেড বা বেতন কোড না পাওয়া, বিএড স্কেল পাওয়ার পর উচ্চতর স্কেল না পাওয়া, এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরে বিএড সনদ অর্জন করলেও পূর্বের সনদের কারণে পদোন্নতি বা উচ্চতর সুবিধা না পাওয়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া অনেক নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলেও দারুল ইহসানের সনদ থাকার কারণে এমপিও সুবিধা পাচ্ছেন না উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষকও।
শিক্ষা প্রশাসনের একটি অংশ বলছে, এসব সমস্যার সমাধানের নামে অবৈধ সনদকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) মো. মিজানুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মাউশির চিঠি আমরা পেয়েছি। তবে এ বিষয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। আদালত কী বলেছে সেটি আমাদের দেখতে হবে, অবৈধ কিছু বৈধ করার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়।’
আরও পড়ুন: কর্মকর্তাদের ছবি ও ভুয়া নম্বরে প্রতারণা, আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, সনদ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগে বন্ধ হওয়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের বৈধতা দেওয়ার বিষয়ে আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০১৮ সালে হাইকোর্টের এক আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থীদের সনদ বৈধ ঘোষণা করা হয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
২০১৮ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে পাঠানো মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে বলা হয়, হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ স্থগিতের ব্যবস্থা ও আপিল দায়েরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে সনদধারীদের আশা ভেঙে যায়। এর আগে ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল উচ্চ আদালতের রায়ে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্যাম্পাস বন্ধ হয়। রায়ে বলা হয়, আইনের দৃষ্টিতে দারুল ইহসান কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয় এবং ভবিষ্যতে এই নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি না দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে মালিকানা বিরোধ, অনিয়ম এবং আউটার ক্যাম্পাসের মাধ্যমে সনদ বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচিত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি। ২০১০ সালের অক্টোবরে এসব অভিযোগ তদন্তে বিচারপতি কাজী এবাদুল হকের নেতৃত্বে একটি এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। ২০১৩ সালের মার্চে কমিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধের সুপারিশ করে।
এর আগে ২০০৭ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আউটার ক্যাম্পাস বন্ধের নির্দেশ দিলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে রিট করে। ওই স্থগিতাদেশের সুযোগে ৩৩টি আউটার ক্যাম্পাস চালু হয় এবং পরে ৩০০টির বেশি শাখা ক্যাম্পাস পরিচালিত হতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে মাউশির পক্ষ থেকে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিলে শিক্ষা প্রশাসনে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি আইনি ও নীতিগতভাবে স্পষ্ট না করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে।