শিক্ষক গণপতিসহ রংপুরের ৪ হত্যায় যে ৫ প্রশ্নের জবাব মিলছে না
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার বিচারের ভার থানা থেকে গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ, দুজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাদের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতদের স্বজনসহ আন্দোলনকারীরা। অন্তত পাঁচ প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন তারা।
তারা বলছেন, এত দ্রুত তদন্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার বিষয়টি তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আর কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি তাদের। হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে শিক্ষার্থীদের সমাবেশ এবং পরিবারের পক্ষ থেকে এমন দাবি তোলা হয়েছে।
হত্যার ঘটনায় রবিবার (২৩ আগস্ট) বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে রাতে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
গত শনিবার রাতে রংপুরের মাছুয়াপাড়ার বাসা থেকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫২), তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে রবিবার সন্ধ্যায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রবিবার ভোরে মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে সিটি বাজারের মাছের দোকান কর্মচারী মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে স্বর্ণের দোকানের কারিগর সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
হত্যার শিকার প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, হত্যার ঘটনায় পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের। কিছুই বুঝতে পারছেন না তারা। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। তারা বলছে, ইয়াবাখোর দুজন নাকি চারজনকে এক এক করে মারছে।
গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিত্ রায়ও পুলিশের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, দুই কম বয়সী ছেলে চার জনকে মেরে ফেলতে পারে না। তাদের ফিজিক্যাল (শরীরের) যে অবস্থা, তাতে চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক আমাদের প্রশ্ন আছে। গণপতির বাড়ির আলমারি ও ড্রয়ার তছনছ করা ছিল। বিদ্যুৎ লাইন ছিল বিচ্ছিন্ন। দুই তরুণ হত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে চাইছে না পরিবার।
হত্যার বিচার চেয়ে জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী নূর বলেন, হত্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুজনকে জড়িত হিসেবে গ্রেপ্তার করে পুলিশের বক্তব্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের সমাবেশে জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাফিয়ার রহমান বলেন, ‘শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনায় নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এ নাটক থেকে বেরিয়ে এসে সত্য উদঘাটন করতে হবে। আমরা সত্য জানতে চাই। খুনিকে আড়াল করার চেষ্টা করলে তার ফল ভালো হবে না।’ খুনিকে আড়াল না করে সত্য উদঘাটন করার জন্য সবাইকে পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান তিনি।
লাশ উদ্ধারের পর ব্রিফিংয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে মাদক সেবনের সময় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে বাধা দেন। পরে প্রথমে তাকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর অন্য তিনজনকে হত্যা করা হয়। এরপর তারা দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করে। গোসল করে খেজুর ও শসা খেয়েছে, আবার মাদকও সেবন করেছে। এ সময় স্বর্ণালংকার খুঁজেছে, মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়ে রেখেছে।
মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের ধারণা ছিল, এটি পরিকল্পিত ডাকাতি। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বলা হয়, হত্যার পর ডাকাতির ঘটনা সাজানো হয়েছিল। অথচ পুলিশেরই দাবি, স্বর্ণালংকার নেওয়া হয়েছিল এবং গ্রেপ্তারদের দেখানো স্থান থেকে উদ্ধারও করা হয়েছে। তাহলে ডাকাতির বিষয়টি পুরোপুরি সাজানো বলা হচ্ছে কেন, তা নিয়েও প্রশ্নে উঠেছে।
জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার বলেন, ‘হত্যাকান্ডের ঘটনায় সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কারা কাটলো। চারজনকে হত্যা করা হলো, আশেপাশের কেউ টের পেলো না কেন। এমন অনেক বিষয় আছে। এগুলো তদন্ত না করেই দুজনকে ধরে বলে দিলো তারা খুনের সঙ্গে জড়িত। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আমরা সত্য জানতে চাই।’
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্ট নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আসামির গায়ের শার্টের সঙ্গে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান সনাতন চক্রবর্তীর শার্টের হুবহু মিল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সোমবার একই ধরনের শার্ট গায়ে দিয়েই বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন ডিবির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আড়ং দেশের একটি স্বনামধন্য ব্র্যান্ড। আমিও দীর্ঘদিন ধরে আড়ংয়ের একটি শার্ট ব্যবহার করছি এবং আজও সেটি পরে আছি। আসামির গায়েও একই ধরনের একটি শার্ট ছিল। শুধু শার্টের মিল দিয়ে কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।’
চারজনকে মাত্র দুজনের পক্ষে হত্যা করা সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চারজনকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়নি। তদন্তে এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে প্রথমে দুজন মিলে একজনকে হত্যা করা হয়। পরে দ্বিতীয় ব্যক্তিকে, এরপর তৃতীয় এবং সবশেষে শিশুটিকে হত্যা করা হয়। তাই ঘটনাটি দুজনের পক্ষে সম্ভব নয়, এমনটি মনে করার কারণ নেই। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত বলা যাবে।
আরও পড়ুন: ১১ দিন ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়ে না ফেরার দেশে যবিপ্রবির আদিবা
বৈদ্যুতিক লাইন কাটার বিষয়ে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, অভিযুক্তরা বাড়িটিতে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করেছিল। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সেখানে ছিল। বের হওয়ার সময় তারা বৈদ্যুতিক লাইন কেটে দেয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, বাড়িটি অন্ধকার করে দিতে এবং বাইরে থেকে কেউ যেন কিছু দেখতে না পারে, সে কারণেই লাইন কাটা হয়েছিল।
কেমিক্যাল ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়েও প্রাথমিক তদন্তে কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় কোনো ধরনের নির্যাতন বা যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। সিদ্ধার্থ ওই নারীকে ‘কাকিমা’ বলে ডাকত বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মুখ ঝলসে যাওয়ার বিষয়টি কোনো কেমিক্যালের কারণে হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে না বলেও জানান ডিবির এই কর্মকর্তা।
এদিকে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস বলেন, ‘আমার ছেলে সহজ-সরল। পুলিশ রাতে বাড়িতে এসে ঘুম থেকে ছেলেকে ডাকতে বলে। আমি তাকে ঘুম থেকে তুলে পুলিশের সামনে আনি। পরে তারা ধরে নিয়ে যায়। আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে বলে শুনেছি, তাই বলে খুন করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাসও ছেলের বিষয়ে একই ধরনের কথা বলেন।
চার মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেছেন, প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। মরদেহের নমুনা সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে। সেখান থেকে পাওয়া প্রতিবেদনের আলোকে চূড়ান্ত মতামত দেয়া হবে। পচন ধরার কারণে তাদের মুখমন্ডল বিকৃত হয়েছে, অ্যাসিড বা কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।