২৩ জুন ২০২৬, ১৪:০৯

জাইমাকে নিয়ে ভুয়া স্ক্রিনশট-ভিডিও ছড়ায় আওয়ামীপন্থীরা, যাচাই না করে মামলা দেয় ছাত্রদল

সাবিদুল ইসলাম সিয়াম  © সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার কলেজছাত্র সাবিদুল ইসলাম সিয়ামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে গ্রেপ্তারের পর ঘটনাটি ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর তদন্তে দাবি করা হয়েছে, সিয়ামের নামে ছড়িয়ে দেওয়া স্ক্রিনশট ও ভিডিও ছিল প্রযুক্তিগত কারসাজির মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া কনটেন্ট। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগপন্থী সাইবার নেটওয়ার্কের কয়েকটি অ্যাকাউন্ট এসব ভুয়া উপাদান ছড়িয়ে দেয়। আর তা যাচাই না করেই ছাত্রদলের নেতারা থানায় অভিযোগ করেন। পরে সেই অভিযোগের সূত্র ধরেই পুলিশ সিয়ামকে আটক করে।

সিয়াম আখাউড়া উপজেলার আজমপুর গ্রামের শাহনেওয়াজ মিয়ার ছেলে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। রবিবার রাতে জেলার সদর উপজেলার একটি আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার দুপুর পর্যন্ত তিনি আখাউড়া থানা হাজতে ছিলেন।

শনিবার রাতে আখাউড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পলাশ মিয়া এবং পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রিফাতুল ইসলাম থানায় পৃথক লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বলা হয়, ‘সাবিদুল ইসলাম সিয়াম’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে। তারা এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।

এরপর সিয়ামকে ঘিরে আলোচনার মধ্যে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডিসেন্ট’ একটি বিস্তৃত টেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ব্রাউজারের ডেভেলপার টুলের ‘ইন্সপেক্ট এলিমেন্ট’ ব্যবহার করে সিয়ামের ফেসবুক আইডি থেকে জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে—এমন ভুয়া স্ক্রিনশট ও স্ক্রিন রেকর্ড তৈরি করা হয় এবং পরে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

দ্য ডিসেন্ট জানায়, গত ১৭ জুন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) পরিদর্শনে যান ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। ওইদিন রাত ৯টা ৫৩ মিনিটে তিনি ১৫টি ছবি সংযুক্ত করে একটি ফেসবুক পোস্ট দেন। পোস্টের একটি ছবিতে তাকে ডি-বক্সের ভেতর থেকে গোলবারের দিকে ফুটবলে শট নিতে দেখা যায়। ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই তার আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গির প্রশংসা করেন।

এর তিনদিন পর, ২০ জুন বিকেল ৫টা ৭ মিনিটে ‘Ryan Draper’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ‘Sabidul Islam Siam’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে জাইমা রহমানকে নিয়ে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যসহ ওই ছবিটি পোস্ট করা হয়েছিল।

স্ক্রিনশটটি প্রকাশের পর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বহু নেতাকর্মী তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে সিয়ামের বিচারের দাবি জানান। বিষয়টি পরে থানায় অভিযোগ পর্যন্ত গড়ায়। ২০ জুন রাতে আখাউড়া পৌর শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রার্থী রিফাতুল ইসলাম তারেক এবং উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক পলাশ মিয়া পৃথক দুটি অভিযোগ দায়ের করেন।

আরও পড়ুন: সিলেটবাসী আপনাদের ভালোবাসায় আমি ধন‍্য: ডিসি সারওয়ার

পরবর্তীতে ২১ জুন দিবাগত রাতে মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে সদর উপজেলার খালার বাড়ি থেকে সিয়ামকে আটক করে আখাউড়া থানা পুলিশ। এ বিষয়ে আখাউড়া থানার ওসি জাবেদ উল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, পূর্বের একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এদিকে ছাত্রদল নেত্রী তাওহীদা সুলতানা ‘Ryan Draper’-এর পোস্ট করা স্ক্রিনশটটি শেয়ার করে লিখেন, “এই ছেলেটা শুনলাম ক্লাস নাইনে পড়ে। শিবিরের জনশক্তি। ক্লাস নাইনের একটা বাচ্চা ছেলে আনোয়ার টিভি, মিমার্স লীগের মতো প্রোপাগান্ডা পেজ চালায়। শিবির রুট লেভেল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ট্রেনিং দিয়ে এদের এরকম বানিয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু কথা হলো দেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠী এই জংলি, অসভ্যদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। সরকার তো এই ইস্যুতে যথেষ্ট স্টেপ নিচ্ছে না।”

বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মানসুরা আলমসহ আরও অনেকে স্ক্রিনশটটি শেয়ার করেন। এছাড়া অনেকেই নিজ নিজ ফেসবুক প্রোফাইলে স্ক্রিনশটটি পোস্ট করেন।

দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, সিয়ামের নামে ছড়ানো স্ক্রিনশটটি ভুয়া। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসন্ধান চালিয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে কথিত ওই পোস্টের অন্য কোনো স্ক্রিনশট, আর্কাইভ বা বিকল্প সংস্করণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, Ryan Draper-এর প্রকাশিত একটিমাত্র সংস্করণই পরবর্তীতে সবাই শেয়ার ও রিপোস্ট করেছেন।

স্ক্রিনশটটি ভাইরাল হওয়ার পর রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্ট-চেকার সোহানুর রহমানও এটি যাচাই করে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এত বড় বিতর্কিত একটি পোস্টের মাত্র একটি স্ক্রিনশট ঘুরে বেড়ানো অস্বাভাবিক। পাশাপাশি তিনি মনে করিয়ে দেন, সংশ্লিষ্ট ভুয়া পরিচয়ের অ্যাকাউন্টগুলোর বিরুদ্ধে অতীতেও জাইমা রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।

এরপর Ryan Draper একটি স্ক্রিন রেকর্ড প্রকাশ করে দাবি করে, শুধু স্ক্রিনশট নয়, তাদের কাছে ভিডিও প্রমাণও রয়েছে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট ‘অরণ্য আবির’সহ একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে সেই ভিডিও রিপোস্ট করা হয়।

তবে দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণে বলা হয়, ওই ভিডিওটিই বরং জালিয়াতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। স্ক্রিন রেকর্ডে দেখা যায়, সিয়ামের প্রোফাইলের কয়েকটি পোস্টে ছবি আপলোড থাকলেও জাইমা রহমান-সংক্রান্ত কথিত পোস্টের ছবিটি ফিডে দেখা গেলেও ‘Photos’ সেকশনে নেই। প্রযুক্তিগতভাবে এটি স্বাভাবিক নয়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ইন্সপেক্ট এলিমেন্ট’ ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে ওয়েবপেজের HTML ও CSS কোড পরিবর্তনের মাধ্যমেই এমন দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব।

দ্য ডিসেন্ট আরও জানায়, ১৮ জুন সকাল ১০টা ৫ মিনিটে সিয়াম মূলত অন্য একটি ফেসবুক পেজের পোস্ট শেয়ার করেছিলেন, যা পরে ‘Unavailable’ হয়ে যায়। অভিযোগ করা হয়, সেই পোস্টের কোড পরিবর্তন করে সেখানে জাইমা রহমানের ছবি ও কুরুচিপূর্ণ ক্যাপশন বসিয়ে স্ক্রিনশট ও স্ক্রিন রেকর্ড তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসিক কোডিং জানা যেকোনো ব্যক্তি ব্রাউজারের ডেভেলপার টুল ব্যবহার করে কোনো ওয়েবপেজ বা ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশন, ছবি, রিঅ্যাকশন, সময়সহ বিভিন্ন তথ্য স্থানীয়ভাবে পরিবর্তন করে স্ক্রিনশট বা স্ক্রিন রেকর্ড তৈরি করতে পারেন। বিষয়টি প্রমাণ করতে দ্য ডিসেন্ট নিজেদের পক্ষ থেকেও একই পদ্ধতিতে Ryan Draper-এর একটি পোস্ট সম্পাদনা করে ভিন্ন ছবি, ক্যাপশন ও সময় দেখিয়ে স্ক্রিনশট ও ভিডিও ধারণ করেছে বলে জানায়।

স্ক্রিন রেকর্ডে আরও কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। Ryan Draper-এর প্রথম প্রকাশিত স্ক্রিনশটে দুটি কমেন্ট ও তিন ধরনের রিঅ্যাকশন দেখা গেলেও ভিডিওতে কোনো কমেন্ট নেই এবং রিঅ্যাকশনের ধরনও আলাদা। দ্য ডিসেন্টের দাবি, ভিডিওতে দৃশ্যমান রিঅ্যাকশনগুলো আসলে সিয়ামের ১৮ জুনের মূল পোস্টের সঙ্গে মিলে যায়, যা ভিডিও সম্পাদনার অভিযোগকে আরও জোরালো করে।

আরও পড়ুন: ডিসি সারওয়ারের বদলিতে মাজারের ইস্যু নেই: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

অন্যদিকে ২১ জুন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে সিয়াম লিখেছিলেন, “আমার নামে যে পোস্ট ও স্ক্রিনশট ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং এডিট করা। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার সম্মানহানি ও সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। যদি কেউ প্রমাণ করতে পারেন যে পোস্টটি সত্যিই আমার আইডি থেকে করা হয়েছে এবং স্ক্রিনশটটি সম্পূর্ণ আসল, তাহলে আমি সব দায়-দায়িত্ব মাথা পেতে নেব।” তবে পরবর্তীতে ওই পোস্টটি আর তার প্রোফাইলে দেখা যায়নি।

দ্য ডিসেন্ট জানায়, সিয়ামের ফেসবুক আইডি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিব হাসানকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, একই নেটওয়ার্কের কিছু অ্যাকাউন্ট অতীতেও জাইমা রহমানকে নিয়ে ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত ছিল।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ২৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে ঘিরে একটি কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য ও এআই-নির্মিত ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে যাচাই করে সেটিও ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। ওই ঘটনায় ডাকসুতে শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামে ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়ানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

দ্য ডিসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, LE O, Ryan Draper ও Aronno Abir নামের অ্যাকাউন্টগুলো অনলাইনে আওয়ামী লীগের সাইবার ফোর্স ‘ক্র্যাক প্লাটুন বাংলাদেশ’-এর হয়ে কাজ করে। এসব পরিচয়-গোপন অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক সাইবার অপরাধের অভিযোগও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্প্রতি দ্য ডিসেন্টের ফেসবুক পেজ, এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির এবং একাধিক সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে ভুয়া রিপোর্ট করে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। পরে Ryan Draper ও Aronno Abir নামের অ্যাকাউন্টগুলো এসব অ্যাকাউন্ট ও পেজ অপসারণের কৃতিত্ব দাবি করে স্ক্রিনশটসহ পোস্টও দেয়।