০৮ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫২

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ, যেভাবে এলো দিনটি

আন্তর্জাতিক নারী দিবস  © সংগৃহীত

আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ–এও দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।

দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও সংস্থা নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা এবং সম্মাননা প্রদান। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও ব্যাংকের উদ্যোগে ‘অদম্য নারী পুরস্কার’ প্রদান, আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রাসহ বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।

এই কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–কে ‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে।

কর্মসূচির মধ্যে আরও রয়েছে অদম্য নারী পুরস্কারের আওতায় বিশেষ অবদান রাখা নারীদের স্বীকৃতি প্রদান এবং দেশজুড়ে নারী অধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলো–এর যৌথ উদ্যোগেও বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক–এর নির্দেশনায় দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে নারী দিবস যথাযথ মর্যাদায় উদযাপন করা হবে।

এ বছর বিশ্বব্যাপী ‘গিভ টু গেইন’ (দিয়ে অর্জন) শীর্ষক প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে, যা নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে তাদের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকা ও বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর

উল্লিখিত প্রতিপাদ্য সামনে রেখে জেলা ও উপজেলায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানিয়েছে মহিলা অধিদফতর। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও দিবসটি পালনে পৃথক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা বিশ্বের সব নারীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব প্রতিবছরের মতো এবারও আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদান ও প্রদীপ প্রজ্বলন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকাল ১১টায় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হবে। এ বছর একজন কৃতী নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হবে এবং সেই সম্মাননা পাচ্ছেন সাংবাদিক মমতাজ বানু।

এদিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি–ও দিবসটি উপলক্ষে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকাল ১০টায় র‍্যালির মাধ্যমে দিবসটির উদযাপন শুরু হবে। সংগঠনটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, পবিত্র মাহে রমজানের কারণে নারী দিবসের অবশিষ্ট অনুষ্ঠান পবিত্র ঈদুল ফিতর–এর পর অনুষ্ঠিত হবে।

বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে উদযাপিত হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।

যেভাবে শুরু হলো দিবসটি

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলন থেকেই দিবসটির ধারণার জন্ম হয় এবং পরবর্তীতে এটি জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়।

১৯০৮ সালে কর্মঘণ্টা কমানো, বেতন বৃদ্ধি এবং ভোটাধিকার দাবিতে প্রায় ১৫ হাজার নারী নিউইয়র্ক শহরের রাস্তায় আন্দোলনে নেমেছিলেন। মূলত সেই আন্দোলনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে নারী দিবস পালনের ধারণার বীজ নিহিত ছিল। এর এক বছর পর সোশ্যালিস্ট পার্টি অব আমেরিকা প্রথম জাতীয় নারী দিবস ঘোষণা করে।

পরে দিনটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদযাপনের প্রস্তাব দেন কমিউনিস্ট ও নারী অধিকারকর্মী ক্লারা জেটকিন। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেন–এ কর্মজীবী নারীদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ওই সম্মেলনে ১৭টি দেশের ১০০ জন নারী প্রতিনিধি তার প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেন।

এরপর ১৯১১ সালে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ড–এ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। ২০১১ সালে দিবসটির শতবর্ষ উদযাপন করা হয় এবং ২০২৪ সালে পালিত হয় ১১৩তম আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

কেন ৮ মার্চ

ক্লারা জেটকিন যখন আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ধারণা দেন, তখন তিনি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ করেননি।

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব–এর আগে পর্যন্ত দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত ছিল না। ওই বছর রুশ নারীরা ‘রুটি ও শান্তি’ দাবিতে তৎকালীন জারের বিরুদ্ধে ধর্মঘট শুরু করেন। চার দিনের মাথায় জার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং পরবর্তী অস্থায়ী সরকার নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে।

সে সময় রাশিয়া–এ প্রচলিত জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নারীদের ধর্মঘট শুরু হয়েছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি, যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ছিল ৮ মার্চ। পরবর্তীতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে ৮ মার্চকেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

নারী দিবসের প্রতীক কেন বেগুনি

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ওয়েবসাইট অনুযায়ী দিবসটির প্রতীকী রং হলো বেগুনি, সবুজ ও সাদা। বেগুনি ন্যায়বিচার ও মর্যাদার প্রতীক, সবুজ আশার প্রতীক এবং সাদা বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই রঙগুলোর ধারণা ১৯০৮ সালে যুক্তরাজ্যের উইমেনস সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন নির্ধারণ করেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুরুষ দিবসও আছে

নারী দিবসের মতো আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবসও রয়েছে। প্রতি বছর ১৯ নভেম্বর এই দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৯০ সালে প্রথম পুরুষ দিবস পালিত হয়, যদিও এটি জাতিসংঘ স্বীকৃত নয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে দিনটি উদযাপন করা হয়।

বিশ্বজুড়ে উদযাপন

বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ৮ মার্চের আগে–পরে কয়েকদিন ফুলের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।

চীন–এর অনেক অঞ্চলে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এদিন নারীদের অর্ধদিবস ছুটি দেওয়া হয়।

ইতালি–তে নারীদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রোমে এই প্রথার প্রচলন শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

আর যুক্তরাষ্ট্র–এ মার্চ মাসকে নারীদের ইতিহাসের মাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিবছর এই উপলক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আমেরিকান নারীদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে একটি ঘোষণাপত্র জারি করেন।

কেন এখনও প্রয়োজন নারী দিবস

বিশ্বের অনেক দেশেই নারীরা এখনও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। আফগানিস্তান, ইরান, ইউক্রেন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, সহিংসতা ও নীতিগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নারীরা নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন।

আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় ফেরার পর নারীদের উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এমনকি বাইরে যেতে হলেও বৈধ পুরুষ সঙ্গী থাকার বিধান চালু করা হয়েছে।

ইরানেও নারী অধিকার ইস্যুতে উত্তেজনা দেখা যায় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় ঠিকভাবে হিজাব না পরার অভিযোগে ২২ বছর বয়সী তরুণী মাহসা আমিনি–কে তেহরানের নৈতিকতা বিষয়ক পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই আন্দোলনে নারীরা হিজাব খুলে আগুনে পুড়িয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং অনেক পুরুষও তাদের সঙ্গে যোগ দেন।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ–এর পর বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, অপুষ্টি, দারিদ্র্য ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বেড়েছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারী। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো–তেও সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।

বিশ্বজুড়ে এসব বাধা ও বৈষম্য দূর করে ভবিষ্যতে নারীদের নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস এখনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নারী ও মানবাধিকারকর্মীরা।