২০ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫৫

হামদর্দ পাবলিক কলেজ: যেখানে স্বপ্নেরা ডানা মেলে

হামদর্দ পাবলিক কলেজ  © টিডিসি সম্পাদিত

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চান্দাই হাট ইউনিয়নের এক জীর্ণ কুটির। সেখানে এসকেন্দার আলীর নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসার। দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারের নুন-ভাতের সংস্থান করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সন্তানকে পড়াশোনা বিলাসিতা। কিন্তু এসকেন্দার আলীর বড় ছেলে মো. রকিবুল ইসলাম দেখছিলেন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন।

পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তির পর ২০১৩ সালে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছিলেন রকিবুল। তবে নুন-ভাতের অনিশ্চয়তায় যার দিন কাটে, সেই মেধার মূল্যায়ন করবে কে? মাদ্রাসার দপ্তরি বাবার পকেটে পয়সা নেই ছেলেকে ভালো কোনো কলেজে ভর্তি করানোর। স্বপ্ন মিলিয়ে যাওয়ার আগে রকিবুলের এই করুণ গল্প খবরের কাগজের পাতায় উঠে আসে—‘একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে’।

সংবাদপত্রের সেই প্রতিবেদনটি নজরে আসে হামদর্দ পাবলিক কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ড. হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়ার। রকিবুলের যাবতীয় পড়াশোনা ও জীবনযাত্রার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। শুরু হয় এক নতুন রূপান্তরের গল্প। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ ও নিবিড় পরিচর্যায় রকিবুল উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় অর্জন করলেন গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান করে নিলেন প্রথম হিসেবে।

সাফল্যের সেই সূর্য সেখানেই থেমে থাকেনি। এরপর ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেধা তালিকায় ১৬তম স্থান অধিকার করেন রকিবুল। কিন্তু প্রকৌশলী হওয়ার উদগ্র বাসনা ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বপ্নের টানে আবারও চ্যালেঞ্জ নিলেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হয়ে সফলতা ও কৃতিত্বের সাথে স্নাতক সম্পন্ন করেন। যে ছেলেটির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, আজ সে দেশের নামকরা প্রকৌশলী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন, পিতার মুখে ফুটিয়েছেন অমলিন হাসি।

২০১২ সাল থেকে ধারাবাহিক সাফল্য পেয়ে আসছে হামদর্দ পাবলিক কলেজ

শুধু রকিবুলই নয়, ১৪ বছর ধরে প্রায় শতভাগ পাসের রেকর্ড করে আসা হামদর্দ পাবলিক কলেজের অনেক শিক্ষার্থীর গল্প এটি। যেমন—পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান আতাউর রহমান। ঝড়-ঝঞ্ঝা ও চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বড় হওয়া আতাউরের এইচএসসিতে ভালো কলেজে পড়ার সামর্থ্য ছিল না। হামদর্দ পাবলিক কলেজ তাকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকার ও পড়ার সুযোগ করে দেয়। এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। পরবর্তীতে ৪২তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে নিজ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে মানুষকে সেবা দিচ্ছেন।

আমাদের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক ফলাফল, দেশের স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সাফল্য এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে তাদের কৃতিত্ব—হামদর্দের  শিক্ষা-দর্শনেরই প্রতিফলন। আমরা চাই, একজন শিক্ষার্থী হামদর্দ থেকে শুধু একটি ভালো ফলাফল নিয়ে নয়, বরং একজন আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ, দায়িত্বশীল ও নেতৃত্বদানে সক্ষম মানুষ হিসেবে তৈরি হোক—  মো. নজরুল ইসলাম, অধ্যক্ষ, হামদর্দ পাবলিক কলেজ

আর নাটোরের লালপুরের দিনমজুরের ছেলে জুবায়ের হোসেন লিখন, যার পিতা ২০১৪ সালে আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর সংসারই ভেঙে পড়েছিল, সেই জুবায়েরকেও টেনে নেয় হামদর্দ পাবলিক কলেজ। এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে জুবায়ের বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ৪র্থ বর্ষে অধ্যয়নরত। আর তার ছোট বোন খাদিজাতুল কুবরাও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হামদর্দ পাবলিক কলেজে পড়ে বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন।

এভাবেই শত শত অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের আলোর দিশা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকার গ্রিন রোডে অবস্থিত এই অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষার গুনগত মান ও ধারাবাহিতার দিক থেকে হামদর্দ পাবলিক কলেজ ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। ২০১০ সালের ১৩ জুন প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি যে মেধা ও ফলাফলের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা দেশের সার্বিক শিক্ষাঙ্গনে এক বিস্ময়। উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে কলেজের শতভাগ (১০০%) পাসের ধারাবাহিকতা অনেকেরই মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

আরও পড়ুন: এসএসসিতে ১,১৯৪ নম্বর পেয়ে জিপিএ-৫  অর্জন সাদিয়া আফরিন কনকের

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালে প্রথম ব্যাচে মাত্র ১৪ জন শিকার্থী নিয়ে কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যারা ২০১২ সালে শতভাগ পাসসহ প্রত্যেকেই সম্মানজনক ফলাফল করে। এরপর ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৯, ২০২০, ২০২২ এবং ২০২৪ ব্যাচেও পাসের হার ছিল ১০০%। এমনকি যেসব বছরগুলোতে পাসের হার শতভাগ ছিল না, সেসব বছরগুলোতেও পাসের হার ৯৮.০৩% থেকে ৯৯.৮৬%-এর নিচে নামেনি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৫ সালের ১৪তম ব্যাচ পর্যন্ত সর্বমোট ৩ হাজার ১০৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন ১ হাজার ৬৬২ জন শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠার পর এই ৩১০৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৬৫০ জনই বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।

কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দিচ্ছেন গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন

কলেজটির শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের প্রথম সারির কলেজগুলো কেবল এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরই ভর্তি নেয়। ফলে তাদের রেজাল্ট ভালো হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু হামদর্দ পাবলিক কলেজের আসল বৈশিষ্ট্য ও কৃতিত্ব অন্য জায়গায়। যে শিক্ষার্থী এসএসসিতে জিপিএ-৪.০০ পেয়ে কিংবা সাধারণ ‘এ’ গ্রেড পেয়ে ভর্তি হচ্ছে, তাকেও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে এইচএসসিতে ‘এ+’ (জিপিএ-৫) পাওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। এ ধরণের বহু শিক্ষার্থী বুয়েট বা মেডিকেল পড়ছেন এবং অনেকে পেশাগত জীবনেও প্রবেশ করেছেন।

আমরা বিশ্বাস করি—শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য নয়; শিক্ষা হলো একজন শিক্ষার্থীকে জ্ঞান, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া— মো. নজরুল ইসলাম, অধ্যক্ষ, হামদর্দ পাবলিক কলেজ

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অসাধারণ ধারাবাহিকতা এবং একাডেমিক উত্তরণ বা জিপিএ উন্নয়নের পেছনে রয়েছে কলেজের একটি দক্ষ, অভিজ্ঞ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক দল এবং তাদের দ্বারা বাস্তবায়িত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। কেবল প্রথাগত শ্রেণীকক্ষ পাঠদানে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রতিটি একাডেমিক ঘাটতি দূর করতে পরিচালনা করেন বহুমুখী কার্যক্রম। এর মধ্যে রয়েছে—বেসিক টেস্ট ও মেধাভিত্তিক সেকশন বিন্যাস, বাধ্যতামূলক স্পেশাল ক্লাস ও কুইজ, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ফেইল রিকভারি টিম (এফ‌আরটি), এইচ‌এসসির শুরু থেকেই অ্যাডমিশন ব্যাচ গঠন, গাইড টিচার ও সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য নৈশকালীন বিশেষ চর্চা।

এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী আইসিটি ল্যাব, বিশ্বমানের বিজ্ঞানাগার ও সমৃদ্ধ পাঠাগার রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে আধুনিক শিক্ষা উপকরণ। দূরের শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিশাল ও নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে।

২০২৫ সালের ফলাফলের পর কলেজের সামনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস

কলেজ সংশ্লিষ্টদের দাবি, যেখানে দারিদ্র্য বা দিকনির্দেশনার অভাবে শত শত মেধাবী তরুণের ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেতে পারত, সেখানে হামদর্দ পাবলিক কলেজ তৈরি করেছে আশার এক অমলিন বাতিঘর। বাৎসরিক প্রায় এক কোটি টাকার শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করে সুবিধাবঞ্চিতদের আগলে নেওয়া, সাধারণ জিপিএ নিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের বুয়েট-মেডিকেলে পড়ার উপযোগ করে গড়ে তোলা এবং শতভাগ সাফল্যের ধারা বজায় রাখা—এসবই আজ হামদর্দ পাবলিক কলেজকে বাংলাদেশের শিক্ষা মানচিত্রে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

আরও পড়ুন: ১৪ বড় চাকরির পরীক্ষায় ফেলের পর হলেন ম্যাজিস্ট্রেট, জানুন আস্থার সাফল্যের ৪ টোটকা

সাফল্যের সূত্র জানতে চাইলে হামদর্দ পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি—শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য নয়; শিক্ষা হলো একজন শিক্ষার্থীকে জ্ঞান, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। তাই নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিবিড় একাডেমিক তদারকি, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধের প্রতি আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। একই সঙ্গে সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম, নেতৃত্বের চর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের সুপ্ত প্রতিভা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করি।

শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস

তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক ফলাফল, দেশের স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সাফল্য এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে তাদের কৃতিত্ব—হামদর্দের এই শিক্ষা-দর্শনেরই প্রতিফলন। আমরা চাই, একজন শিক্ষার্থী হামদর্দ থেকে শুধু একটি ভালো ফলাফল নিয়ে নয়, বরং একজন আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ, দায়িত্বশীল ও নেতৃত্বদানে সক্ষম মানুষ হিসেবে তৈরি হোক।

অধ্যক্ষ আরও বলেন, হামদর্দ পাবলিক কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ড. হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভূইয়া-এর শিক্ষা ও মানবকল্যাণের স্বপ্ন এবং গভর্নিং বডির সম্মানিত সভাপতি অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন-এর দূরদর্শী দিকনির্দেশনায় আমাদের এই অগ্রযাত্রা সম্ভব হচ্ছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হামদর্দ পাবলিক কলেজ আজ সাফল্যের পথে এগিয়ে চলছে—আমাদের প্রত্যয়, এই পথচলা আগামী দিনে আরও সমৃদ্ধ, আরও গৌরবময় হবে।