২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৪৮

‘দুই কোটি টাকা দেন, সই করে দেব’—পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘুষ চাওয়ার ভিডিও ভাইরাল‎

পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন  © টিডিসি সম্পাদিত

আমি দুই কোটি টাকার নিচে নড়ব না, পাঁচ কোটি টাকা থেকে আমাকে দুই কোটি টাকা দেন, আমি সব সই করে দেব এমন কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটির কণ্ঠ লক্ষ্মীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনের বলে অভিযোগ উঠেছে।
‎
‎রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৮ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ভিডিওতে বিভিন্ন প্রকল্পের মালামাল, ঠিকাদারি বিল, ক্রস আর্ম, বিল আটকে রাখা এবং অর্থ লেনদেন নিয়ে কথোপকথন শোনা যায়।

ভিডিওর ‎‎একপর্যায়ে প্রকৌশলী নুরুল আমিনের কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘এসি স্যার রাজি হয়ে গেছে কোনো একটা কারণে, আমি দুই কোটি টাকা থেকে নড়ব না। ছয় কোটি টাকা তিনগুণ না, আমি দুই কোটি টাকার কমে নড়ব না। চেয়ারম্যানের কাছে যেতে হলে যাব। দেখি চেয়ারম্যান কী কয়।’

‎ভিডিওতে আরও শোনা যায়, ‘একটা বিলের জন্য যদি দুই কোটি টাকা নিই, তাহলে চেয়ারম্যান কি আমার বিরুদ্ধে যাবে? আমাকে জায়গামতো পোস্টিং দেবে।’ 

এরপর একটি কাজের মালামালের হিসাব নিয়ে বলা হয়, ‘তিন লাখ টাকার ওয়ার্কে মালামাল লাগে ৩০ লাখ টাকা।’ পরে পাঁচ কোটি টাকার মালামাল আত্মসাতের দাবি করে বলা হয়, ‘পাঁচ কোটি টাকা থেকে আমাকে দুই কোটি টাকা দেন, আমি সব সই করে দেব।’
‎
‎ভিডিওর অন্য অংশে কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে নগদ টাকা গ্রহণের দৃশ্য দেখা যায়। তবে তাদের মুখ স্পষ্ট নয় এবং পরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই অংশে টাকার অঙ্ক নিয়েও কথোপকথন শোনা যায়। একজনকে বলতে শোনা যায়, এখানে কত? অপর ব্যক্তি বলেন, ৩৫ স্যার। তখন কথিত প্রকৌশলীর কণ্ঠে শোনা যায়, এক লাখ ৩৫। ওই ব্যক্তি বলেন, আগে দিয়েছি এক লাখ স্যার।

আরও দেখুন: বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনে জনবল নিয়োগ, আবেদন ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত‎
‎

তবে ভিডিওটি কবে, কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে ধারণ করা হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ভিডিওটি সম্পাদিত কি না, কথোপকথনের সম্পূর্ণ অংশ কী এবং এতে উল্লেখ করা অর্থের সঙ্গে বাস্তব কোনো লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে কি না তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কণ্ঠস্বরের সত্যতাও কোনো প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় যাচাই করা হয়নি।
‎
এ বিষয়ে ‎স্থানীয় ঠিকাদার লোকমান হোসেন বলেন, ‘তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে ঠিকাদারি করছেন। তার অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীর পছন্দের লোক না হওয়ায় বর্তমানে তাকে বাদ দিয়ে সবুজ নামের একজন ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করানো হচ্ছে।’
‎
‎তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদারি করছি। কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলীর পছন্দের লোক না হওয়ায় এখন আমার পরিবর্তে অন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করানো হচ্ছে।’

‎আরও দেখুন: ১৬ পদে ৩৮ শিক্ষক নিয়োগ দেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

‎অন্যদিকে, ভিডিওতে ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে উল্লেখ থাকা ঠিকাদার বিপ্লবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গত ১৫ দিন ধরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ আছেন। ভিডিও বা অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানেন না এবং এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনিচ্ছুক। তিনি বর্তমানে কুমিল্লা জোনে কাজ করেন এবং গত দুই বছর ধরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় তার কোনো কাজ নেই বলেও জানান।
‎
‎অভিযোগ অস্বীকার করে পিডিবির উপসহকারী প্রকৌশলী ইফতে খায়রুল বলেন, ‘গাড়ির জন্য আগে টাকা দেওয়া হয়েছিল। সেটি ঘুষের টাকা নয়।’ দালাল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

‎ভাইরাল ভিডিও ও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে লক্ষ্মীপুর পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনের দাপ্তরিক মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

উল্লেখ্য, ‎ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে পিডিবি লক্ষ্মীপুরের বিরুদ্ধে পুরোনো বিভিন্ন অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের ৩ জুলাই লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সামনে পিডিবির সেবা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছিলেন একদল গ্রাহক। ওই সমাবেশ থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনকে অপসারণের দাবি জানানো হয়।
‎
‎সমাবেশে বণিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল আজিজ, সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদসহ গ্রাহকেরাও বক্তব্য দেন। ওই বক্তারা অভিযোগ করেন, পিডিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ ও অনিয়মের কারণে সাধারণ গ্রাহকেরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ২০২৫ সালের ২২ জুন হঠাৎ করে দুই শতাধিক প্রিপেইড মিটার লক হয়ে যায়। ঘুষ না দেওয়ার কারণে এসব মিটার লক করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

আরও দেখুন: দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়ী: নাহিদ ইসলাম

ওই ‎সমাবেশে দেওয়া লিখিত অভিযোগে ১৬টি অনিয়মের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে সরকারি মিটার ও ট্রান্সফরমার ব্যবহারের নামে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, এলটি সংযোগের ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়া, সরকারি মালামাল বিক্রি, একই ঠিকাদারকে বারবার কাজ দেওয়া, মিটার পরিবর্তন ও সংযোগের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবি এবং সরকারি ফ্রি সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও ছিল তার নামে।