১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০০

শেষ বয়সে বানেছার সঙ্গী শুধু ক্ষুধা, নিঃসঙ্গতা আর দীর্ঘশ্বাস

বানেছা বেগম  © টিডিসি ফটো

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সাধারণত একটু শান্তি, আপনজনের সঙ্গ আর ভালোবাসার আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার মুরাদাবাদ গ্রামের প্রায় ১০০ কোঠার বানেছা বেগমের শেষ জীবনের সঙ্গী এখন শুধু ক্ষুধা, নিঃসঙ্গতা আর দীর্ঘশ্বাস। প্রতিদিন তার সবচেয়ে বড় অপেক্ষা কেউ হয়তো এক মুঠো খাবার হাতে তুলে দেবে।

একসময় হয়তো তারও ছিল স্বপ্ন, ছিল আপনজন, ছিল সংসার সাজানোর গল্প। কিন্তু সময়ের নির্মমতায় সব হারিয়ে আজ তার সঙ্গী শুধু নিঃসঙ্গতা, অভাব আর দীর্ঘশ্বাস।

মুরাদাবাদ গ্রামের এক কোণে টিনের জরাজীর্ণ একটি ঘরে একা থাকেন বানেছা বেগম। বছর শেষে ওই ঘরের ভাড়া মাত্র এক হাজার টাকা। ছোট্ট সেই ঘরটিই এখন তার পুরো পৃথিবী।

বানেছা বেগম জানান, প্রায় ৬০ বছর আগে তার সংসার ভেঙে যায়। এরপর সময়ের সঙ্গে একে একে হারিয়েছেন বাবা-মা, ভাই-বোনসহ সব আপনজনকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে শরীরের শক্তি, আর বেড়েছে অভাবের বোঝা।

একসময় মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার সংগ্রহ করে কোনোভাবে দিন পার করতেন তিনি। কিন্তু এখন বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে সেই শক্তিটুকুও নেই।

তাই দিনের বেশির ভাগ সময় নিজের ঘরের দরজার সামনে বসে থাকেন বানেছা বেগম। পথের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করেন হয়তো কেউ ডাকবে, হয়তো কেউ একটু খাবার হাতে তুলে দেবে।

বানেছা বেগমের গল্প শুধু দারিদ্র্যের নয়, এটি আপনজনহীন হয়ে বেঁচে থাকার গল্পও। কখনো কখনো পুরো দিন কেটে যায় তার চুলায় আগুন জ্বলে না। অসুস্থ হলে মাথায় হাত রাখারও কেউ নেই। ক্ষুধা, অসুস্থতা আর নিঃসঙ্গতার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেই বেঁচে আছেন তিনি।

প্রতিবেশীরাই এখন তার শেষ ভরসা। নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্য থেকেও কেউ এক প্লেট ভাত দেন, কেউ একটু তরকারি দেন, আবার কেউ খোঁজ নিতে আসেন। তাদের ভালোবাসা ও সহায়তাই এখনো বানেছা বেগমকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

তবে প্রতিবেশীদেরও রয়েছে অভাবের সংসার। ফলে চাইলেও নিয়মিতভাবে তার সব প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন না তারা।

প্রতিবন্ধী ভাতার সামান্য টাকাই এখন বানেছা বেগমের একমাত্র সরকারি সহায়তা। কিন্তু বয়সের ভারে এই বৃদ্ধার বেঁচে থাকার জন্য শুধু ভাতার টাকা যথেষ্ট নয়।

তার নেই নিরাপদ কোনো ঘর, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার কিংবা নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা। জীবনের শেষ সময়ে এসে তাই এক মুঠো খাবারের পাশাপাশি ন্যূনতম নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তাও তার কাছে বড় চাওয়া।

বানেছা বেগমের বয়স এখন প্রায় ১০০ কোঠায়। জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কেটে গেছে অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে। আজ তার চোখে বড় কোনো স্বপ্ন নেই। নেই নতুন কোনো চাওয়া, নেই ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা।

আরও দেখুন: তেল সংকটে অচল হাসপাতালের জেনারেটর, তেল পাঠালেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী 

প্রতিদিন সকাল হলে তিনি ঘরের দরজার সামনে এসে বসেন। পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন। হয়তো কেউ আসবে, হয়তো কেউ ডাকবে, হয়তো কেউ এক প্লেট ভাত এগিয়ে দেবে।

আর যদি কেউ না আসে, তবে ক্ষুধা, নিঃসঙ্গতা আর দীর্ঘশ্বাসকে সঙ্গী করেই কেটে যাবে আরও একটি দিন।

এক মুঠো ভাতের অপেক্ষায় থাকা বানেছা বেগমের জীবনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটু মানবিকতা, একটু সহায়তা এবং শেষ বয়সে বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা।

তার প্রতিবেশী আফরোজা বেগম বলেন, তিনি খুবই অসহায়। পৃথিবীতে তার আপন বলতে কেউ নেই। জীবনের শেষ বয়সে এসে তাকে সেবা-যত্ন করার মতোও কোনো মানুষ নেই। আমরা প্রতিবেশীরা যতটুকু পারি, তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু সবসময় তো সম্ভব হয় না, আমরাও গরিব মানুষ।

মোরাদাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. সাগর বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই তাকে একা থাকতে দেখছি। আমরা সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু এখন তিনি এমন বয়সে পৌঁছেছেন, যখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেবা ও যত্ন। তিনি ঠিকমতো রান্নাও করতে পারেন না। উপজেলা প্রশাসন যদি তার পাশে দাঁড়িয়ে একটু সহযোগিতা করত, তাহলে আমরা এলাকাবাসীও খুব খুশি হতাম।’

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম বলেন, ‘বানেছা বেগম দীর্ঘদিন ধরে অসহায় অবস্থায় বসবাস করছেন। স্থানীয়ভাবে যতটুকু সম্ভব তাঁকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে তার জন্য স্থায়ীভাবে কিছু করার প্রয়োজন রয়েছে।’

ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ্ মো. জুবায়ের বলেন, ‘বানেছা বেগমের বিষয়টি জেনেছি। তাঁর প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’