০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০

বিধবার ১০ বছরের সঞ্চয় ছিল জর্দার কৌটায়, প্রয়োজনের সময় খুলে মিলল ছেঁড়া টাকা

মনোয়ারা বেগম  © টিডিসি সম্পাদিত

প্রায় ১০ বছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছিলেন মনোয়ারা বেগম ও তার স্বামী জিয়া উদ্দীন। সংসারের খরচ মিটিয়ে কখনো খুচরা টাকা, কখনো এক হাজার টাকার নোট এভাবেই গড়ে তুলেছিলেন প্রায় দুই লাখ টাকার সঞ্চয়।

নিরাপদ ভেবে সেই টাকা রাখা হয়েছিল একটি জর্দার কৌটায়। কিন্তু প্রয়োজনের সময় কৌটাটি খুলতেই মিলল দীর্ঘদিনের কষ্টে জমানো সেই সঞ্চয়ের ছেঁড়া ও ঝাঁঝরা টুকরো।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোডসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম। প্রায় তিন মাস আগে তার স্বামী মারা গেছেন। এর আগে অনেক কষ্টে দুই মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন তারা। স্বামীকে হারানোর পর জীবিকার পথও সংকুচিত হয়ে আসে। এর মধ্যে শেষ সম্বল হিসেবে রাখা দুই লাখ টাকা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি।

ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, মনোয়ারা বেগম ভোগাই নদী থেকে বালু ও পাথর তুলে বিক্রি করতেন। তার স্বামী জিয়া উদ্দীন ছিলেন মিষ্টি তৈরির কারিগর। দুজনের কষ্টের উপার্জনেই চলত তাদের সংসার। সেই আয় থেকে সংসারের খরচ মিটিয়ে ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রায় ১০ বছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমাতেন তারা।

খুচরা টাকা জমিয়ে পরে এক হাজার টাকার নোট সংগ্রহ করতেন। এভাবে ধীরে ধীরে তাদের সঞ্চয় বাড়তে থাকে। প্রায় আট মাস আগে সেই সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই লাখ টাকা। পরে টাকাগুলো একটি জর্দার কৌটায় রেখে দেন মনোয়ারা।

এরপর প্রায় তিন মাস আগে মারা যান জিয়া উদ্দীন। স্বামীকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই একা সামলাতে হয় মনোয়ারাকে। একই সময়ে ভোগাই নদীতেও আগের মতো পাথর পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে নদী থেকে পাথর তুলে বিক্রি করে তার যে আয় হতো, সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

সম্প্রতি টাকার প্রয়োজন হলে জর্দার কৌটাটি বের করেন মনোয়ারা। কিন্তু দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় কৌটার মুখ কোনোভাবেই খুলছিল না। পরে বাধ্য হয়ে কৌটার মুখ কেটে ভেতরের টাকা বের করেন তিনি। তখনই দেখতে পান, কৌটার ভেতরে থাকা টাকাগুলো ঝাঁঝরা হয়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের কষ্টের সঞ্চয় আর ব্যবহার করার মতো নেই।

মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গেছে তিন মাস হইল। অনেক কষ্টে দুইটা মেয়েরে বিয়া দিছি। আগে তো ভোগাই নদী থাইকা পাথর তুইলা বিক্রি কইরা দিন চালাইতাম। অহন তো নদীতে পাথরও নাই। আল্লাহ আমার শেষ সম্বলটারেও এভাবে নষ্ট কইরা দিল। অহন তো আমার আর কোনো পথ নাই।’

আরও দেখুন: জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে আইসিডিডিআরবি 

তিনি আরও বলেন, ‘এই টাকাডা আছিল আমার শেষ সম্বল। স্বামী নাই, কামকাজও নাই। দশ বছর ধরে একটু একটু কইরা টাকা জমাইছি। ভাবছিলাম, বিপদের সময় এই টাকাডা কাজে লাগামু। অহন সব শেষ হইয়া গেল। অহন আমি কী করমু?’

স্থানীয় বাসিন্দা মিলন শেখ বলেন, ‘মনোয়ারা ও তার স্বামী জিয়া দুজনই খুব কষ্ট করে সংসার চালাইতেন। জিয়ার মৃত্যুর পর অভাবের সংসারে টাকা নষ্ট হওয়ার কথা শুনে সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছি। তাদের বাসায়ও গিয়েছিলাম। মনোয়ারা এখন শুধু কাঁদেন।’

প্রতিবেশী সাদ আল জুনায়েদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন কষ্ট করে সঞ্চয় করা এই টাকা মনোয়ারা বেগমের কাছে শুধু অর্থ ছিল না; স্বামীর মৃত্যুর পর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা ছিল। সেই সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।’

স্বামী হারানোর শোক, জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ১০ বছরের কষ্টে জমানো সঞ্চয় নষ্ট—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে মনোয়ারা বেগমের। তার প্রশ্ন, শেষ সম্বলটুকুও হারানোর পর এখন কীভাবে চলবেন তিনি?