১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৪৮

অন্ধ মায়ের হাত ধরে ভিক্ষায় নামে দ্বিতীয় শ্রেণির নীরব

অন্ধ মা শিউলি আক্তার ও নীরব মিয়া  © টিডিসি ফটো

স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা যে বয়সে, সেই বয়সেই নীরব মিয়ার হাতে উঠেছে মায়ের হাত। তবে স্কুলে যাওয়ার জন্য নয়, বরং ছুটির দিনে অন্ধ মাকে নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে। নীরব মিয়া ময়মনসিংহের নান্দাইল পৌর সদরের নান্দাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। পড়াশোনা করে ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন তার। সপ্তাহের পাঁচ দিন নিয়মিত স্কুলে যায়।

কিন্তু শুক্র ও শনিবার বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেই বদলে যায় তার শৈশবের দৃশ্যপট। সেদিন বই-খাতা রেখে মায়ের হাত ধরে নেমে পড়ে নান্দাইল বাজারে। মানুষের কাছে হাত পেতে যে টাকা পায়, তা দিয়েই চলে তাদের সংসার, মেটানো হয় তার পড়াশোনার খাতা-কলমের খরচ।

নীরবের বয়স অল্প। পৃথিবীটাকে তার চেনার কথা আনন্দ আর খেলাধুলার মধ্য দিয়ে। অথচ অভাব আর অসহায়ত্ব তাকে শিখিয়ে দিয়েছে জীবনের কঠিন বাস্তবতা। নীরবের মা শিউলি আক্তার জন্ম থেকেই দুই চোখে দেখতে পান না। তিনি নান্দাইল পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভূঁইয়াপাড়া গ্রামের চাঁন মিয়ার মেয়ে। ২০১৭ সালে জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের কালিয়ান গ্রামের লালন মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দুই সন্তান জন্মের পর স্বামী তাদের দেখভাল করা বন্ধ করে দেন। এরপর থেকেই দুই সন্তানকে নিয়ে দরিদ্র বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন শিউলি।

নীরবের ছোট ভাই রাব্বি মিয়াও একই বিদ্যালয়ের শিশুশ্রেণিতে পড়ে। দুই সন্তানকে পড়াশোনায় রাখতে চান অন্ধ মা শিউলি। কিন্তু সংসারের নিত্যদিনের খরচ আর সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য তার নেই। প্রতি শুক্র ও শনিবার নীরব মাকে নিয়ে নান্দাইল বাজারে ভিক্ষা করে। দুই দিনে প্রায় হাজারখানেক টাকা আয় হয়। সেই টাকাতেই কোনো রকমে চলে তাদের সংসার। আর সপ্তাহের বাকি পাঁচ দিন নীরব ফিরে যায় তার প্রিয় বিদ্যালয়ে।

নীরবের কণ্ঠে শিশুসুলভ সরলতা। অভাবের কথা বলতে গিয়ে সে বলে, ‘স্কুলে পড়তে তো খরচ লাগে, কেউ তো টেহা দেয় না। স্কুল বন্ধ যে দিন, সেই দিনেই আম্মার হাত ধইরা ভিক্ষা করি বাজারে। আব্বা তো দেহে না, কী করবাম?’

নীরবের কথায় যেমন অভাবের নির্মমতা, তেমনি রয়েছে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

শিউলি আক্তার বলেন, ‘১০ বছর আগে বিয়ে হলেও দুই সন্তান জন্মের পর আর খোঁজ রাখেনি স্বামী। তিন মাস পরপর প্রতিবন্ধী ভাতার কিছু টাকা পেলেও তা দিয়ে সংসার চলে না। দুই ছেলে স্কুলে গেলে মজা কেনার জন্য বায়না ধরে। তাই বড় ছেলেটার সঙ্গে ভিক্ষা করতে বের হই।’

দুই সন্তানকে লেখাপড়া শেখানোর ইচ্ছা থাকলেও জীবনযুদ্ধে প্রতিনিয়ত হেরে যাচ্ছেন শিউলি। চোখে আলো না থাকলেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর স্বপ্ন আছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা অভাব।

নান্দাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিলি আক্তার বলেন, ‘নীরব ও তার ছোট ভাই আমাদের স্কুলেই পড়াশোনা করে। শুনেছি শুক্র ও শনিবার স্কুল বন্ধের দিন সে তার মাকে নিয়ে ভিক্ষা করে। আমাদের স্কুল থেকে তাদের খাতা ও কলম দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।’

আরও পড়ুন: যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে বালিশ চাপা, হত্যায় ব্যর্থ হয়ে শতাধিক কোপ— অভিযুক্ত জাসাস নেতা বহিষ্কার

নীরবের গল্পটি কেবল একটি পরিবারের অসহায়ত্বের গল্প নয়; এটি সমাজের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় একটি প্রশ্ন—একটি শিশুর শৈশব কি শুধুই অভাবের কাছে হার মেনে যাবে?

যে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, সেই হাত যখন মায়ের হাত ধরে মানুষের কাছে সাহায্য চায়, তখন তা কেবল নীরবের পরিবারের দুর্দশার চিত্র নয়; এটি সমাজের সামষ্টিক দায়বদ্ধতারও একটি আয়না।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, ‘এ রকম মানুষদের সহযোগিতা করার জন্য আমরা প্রস্তুত। তাদের কীভাবে সহযোগিতা করলে নিয়মিত আয় হবে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নীরবের স্বপ্ন খুব বড় নয়। সে শুধু পড়তে চায়, স্কুলে যেতে চায়, একদিন ভালো মানুষ হতে চায়। তার মায়েরও চাওয়া সন্তান দুটির যেন তার মতো অসহায় জীবন বেছে নিতে না হয়। নীরবের শৈশব যেন আর ভিক্ষার ঝুলিতে বন্দি না থাকে—এটাই এখন তার পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।