স্বল্প সময়ে বেশি ফলন, যশোরে কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে ব্রি ধান ৯৮
প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও স্বল্প সময়ে ভালো ফলন দিয়ে যশোরের কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্প জীবনকালের ব্রি ধান ৯৮। চলতি আউশ মৌসুমে যশোর সদর উপজেলায় ৯০০ হেক্টর জমিতে এ জাতের ধান চাষ হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হওয়া ঠেকাতে কৃষি বিভাগের সরবরাহ করা ড্রায়ার মেশিনও কৃষকদের জন্য বাড়তি স্বস্তি এনে দিয়েছে।
যশোর সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি আউশ মৌসুমে উপজেলার মোট ১ হাজার ৭১৮ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত প্রোটিনসমৃদ্ধ জাত ব্রি ধান ৯৮। উপজেলার মোট আউশ আবাদের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৯০০ হেক্টর জমিতেই চাষিরা এই জাতের ধান রোপণ করেছেন।
মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রি ধান ৯৮-এর দ্রুত জীবনকাল ও ফলনে দারুণ উৎসাহিত এই অঞ্চলের চাষিরা।
সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের কৃষক ওবায়দুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘গত বছর প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে সাড়ে আট বিঘা জমিতে এই ধান চাষ করে বিঘা প্রতি ১৭ মণ (শুকনা ধান) ফলন পেয়েছি।’ বাজারে এই ধানের চালের চাহিদা ও ভালো দাম পাওয়ায় এবার তিনি সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে ফের এই ধানের আবাদ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এই ধান অত্যন্ত চিকন, ভাত খেতে মিষ্টি এবং বাজারে অনেক চাহিদা। জীবনকাল ১০০ দিনের কম হওয়ায় আউশ কেটে অনায়াসেই জমিতে আমন রোপণ করা যায়। আবার আমনের পর ইরি ধান তোলা সম্ভব। অর্থাৎ একই জমিতে বছরে তিনটি ধান চাষ করা যাচ্ছে। তা ছাড়া অন্যান্য জাতের তুলনায় এই ধানের খড় বেশ লম্বা হয়। কাঁচা নাড়াও হাটে প্রতি আঁটি দুই টাকায় বিক্রি করা যাচ্ছে, যা আমাদের বাড়তি আয়।’
অন্যান্য কৃষকরাও একই কথা বলছেন। কৃষক আজিজুল ইসলাম জানান, এক বিঘা জমিতে মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকার মতো খরচ করে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে কৃষক রুহুল আমিন জানান, মাত্র ১০৫ থেকে ১১০ দিনের মাথায় ধান কেটে ঘরে তোলা যায় এবং এবার বিঘা প্রতি ফলন হয়েছে ১৮ থেকে ২০ মণ। বর্ষায় ‘ড্রায়ার মেশিন’ সাধারণত আউশ ধান কাটার মৌসুমে লাগাতার বৃষ্টি ও রোদের অভাবে ধান শুকানো এবং মাড়াই নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয় চাষিদের। তবে প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠেছেন যশোরের কৃষকরা। বৈরী আবহাওয়ায় ভিজে যাওয়া ধান শুকাতে বিদ্যুৎ-চালিত ড্রায়ার মেশিন ব্যবহার করছেন তারা।
আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের
কৃষক আজিজুল ইসলাম সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘যেভাবে প্রতিদিন বৃষ্টি নামছে, এই ড্রায়ার মেশিনটা আমাদের অনেক উপকারে আসছে। রোদ-বৃষ্টি যাই থাকুক, মাঠ থেকে কাঁচা ধান এনে কারেন্ট দিয়ে মেশিনে দ্রুত শুকিয়ে নিতে পারছি। ধান একটুও নষ্ট হচ্ছে না। আমরা চাই, প্রতিটি কৃষকের ঘরে ঘরে এ রকম ড্রায়ার মেশিন যেন পৌঁছায়।’
প্রোটিনসমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাদ্য সম্প্রতি যশোর সদরে সরকারিভাবে ব্রি ধান ৯৮-এর নমুনা শস্য কর্তন উৎসব হয়েছে। ফসল কর্তন অনুষ্ঠানে যশোর সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মোসা. রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘বিজ্ঞানের নিখুঁত পরিমাপ অনুযায়ী এই জাতটির গড় জীবনকাল ১১২ দিন। ১৮ থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বীজ বপন বা রোপণ করে এবং ৩০ জুন থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে অনায়াসে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব।’
এই কৃষি অফিসার আরও বলেন, ‘নমুনা শস্য কর্তনে আমরা প্রতি হেক্টরে ৫ দশমিক শূন্য ৯ টন ফলন পেয়েছি, যা আউশ মৌসুমের জন্য অত্যন্ত সন্তোষজনক। তবে এই ধানের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এটি উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ। এখন আমাদের পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা বেশি, আর ব্রি ধান ৯৮-এ প্রায় ৯ শতাংশ প্রোটিন বিদ্যমান। এর ভাত ঝরঝরে ও সুস্বাদু।’
স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় এটি কাটার পর কৃষকরা শুধু আমনই নয়, চাইলে শীতকালীন আগাম সবজি চাষের দিকেও যেতে পারছেন। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধান যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য কৃষকদের যে ড্রায়ার মেশিন দেওয়া হয়েছে, তা সরাসরি মাঠের ভেজা ধান প্রক্রিয়াজাতকরণে অভাবনীয় কাজ করছে জানান তিনি।
খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি কৃষকদের দ্রুত সময়ে বহুবিধ ফসল ফলানোর সুযোগ করে দেওয়ায় ব্রি ধান ৯৮ এবং কৃষিতে প্রযুক্তির এমন সংযোজন যশোরের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষিবিদরা।