১১ আগস্ট ২০২৬, ২২:০২

একটি ফল, ঝরে গেল ৭ প্রাণ—এসএসসির ফল কি জীবনের চেয়েও বড়?

ফল প্রকাশের পর যাদেরকে হারিয়েছে তাদের পরিবার  © টিডিসি সম্পাদিত

একটি পাবলিক পরীক্ষার ফল। কেউ পেয়েছে জিপিএ-৫, কেউ করেছে ফেল। অথচ এই পাস-ফেলই কোনো কোনো শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে উঠছে জীবন-মৃত্যুর লটারি। কেউ পরিবারের চাপে বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। সোমবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায়—পরীক্ষায় পাস-ফেল কি সবকিছু? এ প্রশ্নটি সামনে আসছে।

গত সোমবার (১০ আগস্ট) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, শেরপুর ও গোপালগঞ্জে অন্তত ৭ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের কারও ফল আশানুরূপ হয়নি, কেউ একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। ফল প্রকাশের পর হতাশা, লজ্জা কিংবা মানসিক চাপ থেকে কয়েকজনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে পরিবার ও স্থানীয়রা জানিয়েছে।

এ দিকে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর যেসব ঘটনা সামনে এসেছে:

রাজশাহীতে ১ শিক্ষার্থীর মৃত্যু
গতকাল (১০ আগস্ট) রাজশাহীর বাগমারায় এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করে কারিনা পাল (১৬) নামে এক পরীক্ষার্থী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। মহব্বতপুর গ্রামের কারিনা চাঁন্দেরআড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফলাফল দেখার পর ঘরে গিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দেয় সে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

সোমবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, শেরপুর ও গোপালগঞ্জে অন্তত ৭ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের কারও ফল আশানুরূপ হয়নি, কেউ একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। ফল প্রকাশের পর হতাশা, লজ্জা কিংবা মানসিক চাপ থেকে কয়েকজনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে পরিবার ও স্থানীয়রা জানিয়েছে।

কুষ্টিয়ায় ১ শিক্ষার্থীর মৃত্যু
গতকাল (১০ আগস্ট) কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় এসএসসি পরীক্ষায় দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে তানিয়া খাতুন (১৬) নামে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। সে বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। ফলাফল প্রকাশের পর রাতে নিজ কক্ষে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেন স্বজনরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিক্ষার্থীর বিষপান
গতকাল (১০ আগস্ট) চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে এসএসসি পরীক্ষায় ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়ে বিষপানে হালিমা খাতুন তরিকা (১৬) নামে এক শিক্ষার্থী মারা গেছে। হালিমা চাকপাড়া আদর্শ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। ফলাফল প্রকাশের পর হতাশ হয়ে সে বিষপান করে বলে স্বজন ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

চাঁদপুরে ১ শিক্ষার্থীর মৃত্যু
গতকাল (১০ আগস্ট) চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে এসএসসি ফলাফল প্রকাশের পর শামীমা আক্তার মুন্নি (১৬) নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। সে চেড়িয়ারা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী এবং দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিল।

চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ
গতকাল (১০ আগস্ট) চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় এসএসসি পরীক্ষায় পাঁচ বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর আদনানুজ্জামান নিহাল (১৯) নামে এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহাল পূর্ব বাকলিয়া সিটি করপোরেশন বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। সোমবার ফল প্রকাশের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল সে বলে পরিবার জানিয়েছে। মঙ্গলবার সকালে কালামিয়া বাজার এলাকার বাসা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ; প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও তদন্ত চলছে।

শেরপুর চার বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মৃত্যু
গতকাল (১০ আগস্ট) শেরপুরের নকলায় এসএসসি পরীক্ষায় চার বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর দিয়ামনি অন্তি (১৬) নামে এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ফল প্রকাশের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল অন্তি; স্বজনদের ধারণা, লজ্জা ও ক্ষোভ থেকে সে আত্মহত্যা করেছে। মঙ্গলবার সকালে চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চরবাছুর আগলি গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে এবং মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

গোপালগঞ্জে অকৃতকার্য হয়ে ১ শিক্ষার্থীর মৃত্যু
গতকাল (১০ আগস্ট) গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর অভি বিশ্বাস (১৭) নামে এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ফল প্রকাশের পর অকৃতকার্য হওয়ার খবর জেনে হতাশ হয়ে নিজ ঘরে আত্মহত্যা করে অভি। সে বেদগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী এবং কাশালিয়া ইউনিয়নের বেদগ্রামের গোপাল বিশ্বাসের ছেলে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে; এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেঁচে থাকার জন্যই পড়াশোনা। এতে সাময়িক ব্যর্থতার কারণে জীবন দেওয়া নয়। কথাটি ছোট হলেও মানকে পারেন না অনেকে। আমদের মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে। জীবনে নানা ব্যর্থতার পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের সফলতার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসা জরুরি। জীবনের মূল্য বেশি। জিপিএ ৫ পাওয়া কিংবা এসএসসি পাশ করাই জীবনের একমাত্র সফলতা নয়। 

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পরীক্ষার ফলকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের ওপর পরিবারের প্রত্যাশার চাপ অনেক সময় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বিশেষ করে জিপিএ-৫ কিংবা ভালো ফলাফলকে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের খারাপ কিছুর দিকে ঠেলে দেয়।

আরও পড়ুন: শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ৩ আগস্টের বৈঠকের রেজুলেশনের কী হবে?

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসাম্মৎ মালেকা পারভীন বলেন, শিক্ষার্থীরা একটি কম্পিটিশনের মধ্য দিয়ে যায়। ফলে প্রথমেই শিক্ষার্থীদের মাথায় রাখতে পারে আমার ফল খারাপ হতে পারে, আবার ভালো হতেপারে। এটা মাথায় নিতে হবে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেই সব শেষ হয়ে যায় না। তাঁরা এটা বুঝতে চায় না। ফলে শিক্ষাথীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ্ রাখতে দেশের প্রতিটি স্কুলে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। 

ড. মোসাম্মৎ মালেকা পারভীনের মতে, শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর পর সাংবাদিকরা কিছু লিখবে, দুএকটা কলাম লিখা হবে। এরপরে এ বিষয়টি পরে আর আলোচনায় থাকবে না। ফলে রাষ্ট্রের একটি ‘Preventive measure’ (প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা) থাকা দরকার বলে তিনি মতামত দেন। এর মাধ্যমে বছরে ৫টি সেশনও যদি নেয় তাহলে আত্মহত্যা কমে যাবে অনেকটাই। 

তিনি আরো বলেন, পরিবারের প্রত্যাশা কমাতে হবে। পরিবারের সদস্যরা মনে করেন জিপিএ ৫ পেলেই তার বাচ্চা সফলতা। এ চিন্তাটি সঠিক নয়। কারণ প্রত্যেকটি সন্তানের মধ্যে কিছু সুপ্ত প্রতিভা থাকে। ফলে পরিবারেরও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবারকে সচেতন করতে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের কনটেন্ট তৈরি করা যেতে পারে। কোনো সন্তান অকৃতকার্য  হলে পরিবারকে বলতে হবে, তোমার আরো ইনার পটেনশিয়ালিটি রয়েছে। সেগুলো আরো উন্নত করতে হবে। প্রত্যেক পরিবার এভাবে সচেতন করা সম্ভব হলে আত্মহত্যা কমে যাবে।