৩০ জুন ২০২৬, ১৭:৩৭

একটি সেতুর ভাঙনে দুর্ভোগে ২০ গ্রামের মানুষ

টিডিসি সম্পাদিত  © টিডিসি

জামালপুরের সরিষাবাড়ী ও মাদারগঞ্জ উপজেলার সংযোগকারী শুয়াকৈর সেতু ভেঙে যাওয়ার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও পুনর্নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রায় ২০ গ্রামের হাজারো মানুষ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ নৌকা ও অস্থায়ী সাঁকোতে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন, চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ।

২০২০ সালের ২১ জুলাই ভয়াবহ বন্যার তীব্র স্রোতে সেতুর মাঝখানের একটি পিলার ও স্প্যান ধসে পড়ে। এরপর কেটে গেছে ছয় বছর, কিন্তু ভাঙা অংশটি স্থায়ীভাবে সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার প্রবল স্রোতের পাশাপাশি সেতুর একেবারে গা ঘেঁষে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণেও সেতুটি ধসে পড়ে। ফলে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে জামালপুরের সরিষাবাড়ী ও মাদারগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২০ গ্রামের মানুষের যাতায়াত বর্ষাকালে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে অস্থায়ী বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০০৩-০৪ অর্থ বছরে শুয়াকৈর-হুদুর মোড় এলাকায় ঝিনাই নদীর ওপর প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এইচ এন্টারপ্রাইজ ২০০৬ সালে সেতুর কাজ শেষ করলে তা চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু নির্মাণের মাত্র ১৪ বছরের মাথায় ২০২০ সালের ২১ জুলাই বন্যার পানির স্রোতে দুটি পিলার ও দুটি গার্ডারসহ সেতুর মাঝখানের প্রায় ৬০ মিটার অংশ ধসে নদীতে ভেঙে পড়ে যায়। এর পর থেকেই ওই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় সরিষাবাড়ী উপজেলার চররৌহা, চরনান্দিনা, বড়বাড়ীয়া, বীর বড়বাড়ীয়া, হেলেঞ্চাবাড়ী, স্বাধীনা বাড়ী, চরহাট বাড়ী, সিধুলী, চুনিয়াপটল, সিংগুরিয়া, ডিগ্রী পাজবাড়ী, খন্দকার বাড়ী, চরছাতারিয়া, আদ্রা এবং পার্শ্ববর্তী মাদারগঞ্জ উপজেলার চর লোটাবর, শ্যামগঞ্জ কালিবাড়ী, সদরাবাড়ী ও রায়েরছড়াসহ দুই উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে। বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে নৌকাই যাতায়াতের একমাত্র ভরসা।

আরও পড়ুন: মাদ্রাসা শিক্ষাকে শুধু প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না: শিক্ষামন্ত্রী

সরজমিনে দেখা যায়, সেতুর দু পাশে রাস্তা থাকলেও কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। বর্তমানে ঝিনাই নদীর মাঝে পানি। সেতুর দুই পাশের মাঝখানের বিশাল অংশটি ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়াই দুই পাড়ের শত শত মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই গভীর পানি পাড়ি দিচ্ছেন। নদীতে পানি থাকায় একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে নৌকা। সেই নৌকায় করেই নিত্যদিন পারাপার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা

স্থানীয়রা অভিযোগ, আগে সেতু ভালো থাকতে যে পথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে মাত্র ২০ মিনিট সময় লাগত, এখন অন্য রাস্তা ঘুরে সেই পথ পেরোতে ১থেকে ২ ঘণ্টাও লেগে যাচ্ছে। ভাড়াও বেশি লাগছে। বিশেষ করে নৌকার জন্য ঘাটে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

এই যোগাযোগ সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থী সৌরভ হাসান বলেন, ‘সেতুটা ভালো থাকতে আমরা বাড়ি থেকে বের হয়ে মাত্র ১৫-২০ মিনিটে কলেজে চলে যেতে পারতাম। আর এখন অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগে। আবার বর্ষাকালে নৌকায় গাদাগাদি করে উঠতে হয়, জামাকাপড় ভিজে যায়। অনেক সময় ঘাটে নৌকা না পেয়ে প্রথম দুইটা ক্লাস ধরাই সম্ভব হয় না। প্রতিদিন এই নদী পার হতে গিয়ে আমাদের জীবন যেমন ঝুঁকিতে থাকে, তেমনি পড়াশোনারও ক্ষতি হচ্ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা মনু মিয়া বলেন, ‘নেতারা ভোট আইলে সেতু কইরা দেওয়ার বড় বড় কথা কয়, ভোট গেলে আর খোঁজ থাকে না। বছরের পর বছর পার হইয়া গেল আমরা নদীর পানি পাড়ি দিয়া যাতায়াত করতাছি, আমাগো কষ্ট দেখার কেউ নাই। সবাই শুধু আমাদের আশা দিয়ে যায়, কিন্তু দুর্ভোগ দূর করতে কেউ বাস্তবে এগিয়ে আসে না।’

শুয়াকৈর এলাকার কৃষক সৈকত বলেন, ‘সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় আমাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এখান থেকে শহরে মালামাল নেওয়া যায় না। আবার শহরের কেউ এখান থেকে মালামাল কিনতেও আসে না। শহরের আমাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য নিতে গেলে বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়। ফলে আমরা সবদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এই সেতুটি নির্মাণ করে দিলে আমরা খুব উপকৃত হব।’

আরও পড়ুন: ভিসির ক্ষমতা কমাতে গঠিত নিয়াজ প্রশাসনের সেই এসএমটি বাতিল সিন্ডিকেটে

আরেক কৃষক সামিউল হক বলেন, ‘নদীতে সেতু নাই, রাস্তাঘাট ভাঙা। এই চরের জমিতে রক্ত পানি করে যে ফসল ফলাই, তা সময়মতো বাজারে নিতে পারি না। ১ ঘণ্টার পথ যাইতে এখন চার ঘণ্টা ভ্যান ঠেলতে হয়। সময় বেশি লাগে দেইখা তরকারি ঘাটে আসতেই অনেক সময় নষ্ট হয়া যায়, পাইকাররা দাম কমায় দেয়। আগে যে মাল শহরে নিয়া ভালো দামে বেচতাম, এখন বাড়তি ভাড়ার ভয়ে গ্রামেই পানির দামে বেইচা দিতে হয়। এই ভাঙা সেতু আমাগো কৃষকদের কোমর ভাইঙা দিছে।’

দীর্ঘ ৬ বছর ধরে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে সরিষাবাড়ী উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) গোলাম কিবরিয়া তমাল বলেন, ‘সেতুটি নতুন করে নির্মাণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই আমরা মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। শুয়াকৈর সেতুটি দ্রুত সংস্কারের জন্য দাপ্তরিক সব প্রস্তুতি আমাদের পক্ষ থেকে চলমান।’