০৪ জুন ২০২৬, ১১:২৪

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভ্যাপসা গরমে বিপর্যস্ত জনজীবন, হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ

তীব্র গরমে পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণের চেষ্টা গরুর  © টিডিসি ফটো

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুই জেলা যশোর ও ঝিনাইদহে ভ্যাপসা গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যশোরে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকলেও বাতাসে  তীব্র তাপপ্রবাহে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। অন্যদিকে ঝিনাইদহে প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হাঁসফাঁস করছে মানুষ ও প্রাণীকুল। এ অবস্থায় দুই জেলাতেই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।

যশোর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমানঘাঁটির আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে বাতাসে আর্দ্রতা ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করায় অনুভূত তাপমাত্রা অনেক বেশি ছিল। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আর্দ্রতা বেশি থাকলে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না, ফলে শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং অস্বস্তি বাড়ে।

অন্যদিকে ঝিনাইদহের ওপর দিয়ে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ওঠানামা করায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরমে প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। তবে জীবিকার তাগিদে বাইরে থাকা শ্রমজীবী মানুষদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

যশোর শহরের মনিহার, জিরো পয়েন্ট, পৌর পার্ক, রেলগেট ও বকচর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, মানুষ ঘন ঘন পানি পান করছেন এবং গরমে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। একই চিত্র দেখা গেছে ঝিনাইদহ শহরেও। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে শরবত ও ঠান্ডা পানীয়ের দোকানে ভিড় করতে দেখা গেছে। জেলা শহরের ডিসি বাংলোর পাশে একটি গরুকে পানির ট্যাপ থেকে পানি পান করতে দেখা যায়, যা প্রাণীকুলের দুর্ভোগের চিত্রও তুলে ধরে।

আরো পড়ুন: চলতি বছর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিড ডে মিল পাবে: শিক্ষামন্ত্রী

রিকশাচালক আলীবুদ্দিন বলেন, ‘সকাল থেকে রিকশা চালাচ্ছি। রোদ আগের মতো তীব্র না হলেও গরমে শরীর ভিজে যাচ্ছে। বারবার পানি খেতে হচ্ছে। একটু পরপরই ক্লান্ত লাগছে।’ ঝিনাইদহের দিনমজুর জামিরুল ইসলাম বলেন, ‘রোদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে ঘাম ঝরছে অবিরাম। কিছুক্ষণ পরপর বিশ্রাম নিতে হচ্ছে।’

যশোরের পৌর পার্ক এলাকায় কাজ করা নির্মাণশ্রমিক আবু বক্কর বলেন, সারাদিন কাজ করতে গিয়ে প্রচুর ঘাম হচ্ছে। মাথা ঝিমঝিম করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পানি আর স্যালাইন খেতে হচ্ছে।’ ঝিনাইদহের ইজিবাইক চালক বাবু মিয়া বলেন, ‘সকাল থেকেই প্রচণ্ড গরম। দুপুরের দিকে গাড়ি চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে যায়। গরমে যাত্রীও কমে গেছে।’ 
 
গরমের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে হাসপাতালগুলোতেও। যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গরমজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে ডায়রিয়া, বমি, পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও জ্বরের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।

গত ৫ জুন যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৫৮৭ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ১৭ জন এবং মেডিসিন ওয়ার্ডে অন্তত ৫৯ জন পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও জ্বরের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। একইদিনে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন এক হাজার ৯৭৭ জন রোগী।

আবহাওয়াবিদ ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃষ্টিপাত না হলে তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমের পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে। তাই প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া, হালকা রঙের সুতি পোশাক পরা, ছাতা বা টুপি ব্যবহার করা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরো পড়ুন: সন্তানের অবহেলায় বাবা-মার করুণ পরিণতি, কী আছে ভরণপোষণ আইনে?

চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বের হয়ে যাওয়ায় পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমিভাব, রক্তচাপের ওঠানামা এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জাকির হোসেন বলেন, ‘বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্রমজীবী মানুষদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে। বেশি বেশি পানি পান করতে হবে এবং প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।’

যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, ‘বর্তমানে তাপমাত্রার পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক বেশি থাকায় মানুষ বেশি অস্বস্তি অনুভব করছে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি ও ইলেকট্রোলাইট বের হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকের পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও অন্যান্য তাপজনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘যারা বাইরে কাজ করেন তারা অবশ্যই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করবেন। বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজন হলে ওরস্যালাইন বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত স্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত স্যালাইন গ্রহণ করা উচিত নয়। শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘দুপুরের প্রচণ্ড ভ্যাপসা আবহাওয়ায় অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে গেলে ছাতা, টুপি বা হালকা রঙের সুতি পোশাক ব্যবহার করা উচিত। কারও মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে।’