১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৫৬

যা আছে ১৫৯ বছরের পুরাতন ‘ধর্ম্মবিবাদ’ কাব্যে

কবির স্বহস্তে লেখা পাণ্ডুলিপি  © লেখকের সৌজন্যে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দুষ্প্রাপ্য শাখায় সংরক্ষিত রয়েছে বিভিন্ন ভাষার প্রায় ৫৬৫টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। এরই একটি হামিদুল্লাহ খান বাহাদুর বিরচিত ‘ধর্ম্মবিবাদ’ কাব্য। রচয়িতার বর্ণনা অনুসারে, পুঁথিটির রচনা শেষ হয়েছে ১২৭৩ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে (খ্রিস্টীয় ১৮৬৭)। পাশাপাশি এতে ১২৮৩ হিজরি সনও উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলা সন হিসেবে কাব্যটি ১৫৯ বছরের পুরাতন। পাণ্ডুলিপির সংগ্রাহকদের মতে এটি কবির নিজ হাতে লেখা মূল কপি।

কাব্যটির বিষয়বস্তু হলো হজরত মুহাম্মাদ (স.)-এর পরলোক গমনের পর আসহাবগণের মধ্যে খেলাফতের বিষয় নিয়ে মনোমালিন্যের কারণ ও এর ফলাফল। কাব্যটি আবদুস সাত্তার চৌধুরীর সহায়তায় আবিষ্কার ও উদ্ধার করেন সাহিত্যিক মাহবুবুল আলম। এই নামে অন্য কোনো রচয়িতার অন্য কোনো পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়নি। এদিক থেকে এই কাব্যের বিশিষ্টতা রয়েছে।

পাণ্ডুলিপিটি দৈর্ঘ্যে ১১.৫ ইঞ্চি ও প্রস্থে ৬.৫ ইঞ্চি। সর্বমোট পাতা রয়েছে ৩১৪টি। মাঝে মাঝে আরবি হরফে কোরআনের আয়াতও লেখা আছে। তুলো থেকে উৎপন্ন হালকা হলুদাভ বর্ণের ‘তুলট’ কাগজের উভয় পাশে এটি লেখা হয়েছে। বোধগম্যতার দিক থেকে বর্তমান বাংলার সাথে কিছুটা তফাৎ থাকলেও লেখকের হাতের লেখা বেশ উৎকৃষ্ট মানের।

কাব্যের শুরুতেই কবি আরবিতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লিখে শুরু করেছেন। এরপর ‘ধর্ম্মবিবাদ নামক পুস্তকের নির্ঘণ্ট’ অর্থাৎ সূচিপত্র দিয়েছেন প্রায় ১৫ পৃষ্ঠা জুড়ে। শুরুতেই এক স্থানে পবিত্র কোরআনের সূরা নূরের ৫৫ নম্বর আয়াত আরবি হরফে লেখা হয়েছে। এটাকে ‘খেলাফতের আয়ত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, পাণ্ডুলিপিতে এই সূরার নাম বা আয়াত সংখ্যা উল্লেখ নেই।

পুঁথিটির প্রথম কয়েকটি চরণ এরকম—

‘আদ্যে আল্লা নিরঞ্জন প্রভু নাম স্মরি
যে সৃজিল মানব ফিরিস্তা দত্য পরি
স্বর্গমর্ত্য পাতাল সকল তৃ ভুবন
জল তট চন্দ্র সূর্য্য নক্ষত্র গগন
সেই সে পরম কর্ত্তা রাজ রাজেশ্বর
সিংহাসন সপ্ত সিড়ি গগনের পর’

অর্থাৎ রচয়িতা রচনার শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করেছেন। যিনি ফেরেশতা, দৈত্য, পরী, তিন ভুবন, জল-স্থল, চাঁদ-সূর্য, নক্ষত্র-আকাশ সৃষ্টি করেছেন।

আরও পড়ুন: বিনষ্টের ঝুঁকিতে আলিয়া মাদ্রাসা গ্রন্থাগারের আড়াইশ বছরের দুষ্প্রাপ্য বই

প্রাচীন সাহিত্যে কবি বা রচয়িতারা নিজের পরিচয়জ্ঞাপক পদ বা উক্তি রচনা করতেন, যাকে ‘ভণিতা’ বলা হয়। ভণিতায় রচয়িতার নাম, পরিচয় বা অন্যান্য বিষয় উল্লেখ থাকে। ধর্ম্মবিবাদ কাব্যেও কবির নাম সংবলিত ভণিতা পাওয়া যায়। যেমন: পাণ্ডুলিপির ১৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে—

‘আহা প্রভু হামিদে অসুদ্ধ যদি কহে
ক্ষেমসে এ অবস্থাতে মনস্থির নহে’

অর্থাৎ লেখক হামিদ এই পদ রচনার সময় ভুল করে যদি কোনো অশুদ্ধ কিছু লিখে, তাহলে প্রভু যেন তাকে ক্ষমা করে দেয়। এর পরের চরণে লেখক বলেছেন, যখন তার প্রাণ নেওয়া হবে তখন যেন প্রভু তাকে ইমান দেয়। এছাড়া ৩৩২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে—

‘হামিদ কিতাব হতে এমত জানিলো
মরওয়ান প্রভৃতি জে বিপক্ষে আছিল’

এখানেও লেখক নিজের নাম উল্লেখ করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় এটির রচয়িতা হামিদ বা হামিদুল্লাহ খান বাহাদুর।

শেষের কয়েকটি চরণ—

‘কিন্তু মম মনস্কাম ইমানে মরন
রছুল সাক্ষাতে জাই ছালাম করন
তান সফাআত মুই প্রভু কৃপা পাই
হাসরেতে মুক্ত পাই বেহেস্তেতে জাই
স্ত্রি পুত্র ভালাই চাহি জেন চাহি আপ্ত
প্রভু করে মোর মন মানস সমাপ্ত
আমিন আমিন কহি হে পটুয়া গণ
প্রভুর প্রসাদ মাগ আমার কারণ’।

কাব্যের ‘সমাপ্ত’ উল্লেখ করার পরও কবি ‘হিত উপদেষ নামক প্রস্তাব’ শিরোনামে আরও ৪২টি চরণ এবং ‘উপদেশ— পদবন্দি’ শিরোনামে প্রায় ১৬টি চরণ রচেছেন। এরপর আরও সাত পৃষ্ঠা জুড়ে বিশেষ ‘গিত’ উল্লেখ করেছেন। সূচিপত্রসহ কাব্যের মোট লেখাযুক্ত পৃষ্ঠা ৬২৭টি।

কবি হামিদুল্লাহ খান বাহাদুর চট্টগ্রামের অন্যতম অভিজাত বংশের সন্তান ছিলেন বলে জানা যায়। ফারসি ভাষায় তিনি চট্টগ্রামের ইতিহাস রচনা করেছেন, যাকে ‘তারিখে হামিদীয়া’ বলা হয়ে থাকে। এছাড়া ‘শাহাদতনামা’, ‘ত্রাণ পথ’ নামক আরো কয়েকটি পুঁথি রচনা করেছেন তিনি। তার বংশধরেরা চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জ নামক স্থানে বসবাস করতেন বলে জানা যায়।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়