২১ জুলাই ২০২৬, ১৫:৪২

আনারসের পাতায় তৈরি হচ্ছে পশুখাদ্য ‘সাইলেজ’, বাড়ছে দুধ-মাংস উৎপাদন, কমছে খরচ

মিক্সার মেশিনের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে পশুখাদ্য ‘সাইলেজ’  © টিডিসি

একসময় আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো আনারসের পাতা। সেই পরিত্যক্ত পাতাই এখন আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হচ্ছে গবাদিপশুর পুষ্টিকর খাদ্য ‘সাইলেজ’। টাঙ্গাইলের মধুপুর ও ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া-মুক্তাগাছা অঞ্চলে এই উদ্যোগ কৃষি বর্জ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি খামারিদের খাদ্য ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমাচ্ছে এবং উদ্যোক্তা ও আনারসচাষিদের জন্য তৈরি করছে নতুন আয়ের সুযোগ।

কৃষি ও প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, গবাদিপশুকে আনারসের পাতার তৈরি সাইলেজ খাওয়ালে গরুর দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে আনারসের পাতায় থাকা বিশেষ ফাইবার ও শর্করার কারণে দুগ্ধবতী গাভীর দুধ উৎপাদন দৈনিক ২-৩ লিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং গরুরও শারীরিক বৃদ্ধি হয়। গাজনপ্রক্রিয়ার ফলে পাতার শর্করা ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়, যা গরুর হজমশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে।

ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী উপজেলা টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার বীরবাইদ ইউনিয়নের চুনিয়া ফৈটামারি গ্রামে সরেজমিন দেখা গেছে, বিশেষ কারিগরি সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ একটি সাইলেজ তৈরির মিক্সার মেশিনের গবাদিপশুর খাদ্য তৈরি করার জন্য আনারসের পাতা সংগ্রহ করে ওই পাতাগুলো মেশিনের মাধ্যমে প্রসেসিং করা হচ্ছে। মেশিনের অপর প্রান্তে প্রসেসিং করা আনারস পাতায় তৈরি সাইলেজ প্লাস্টিকের বস্তায় ভর্তি করা হচ্ছে। এ সময় এই প্রতিবেদনের সঙ্গে কথা হয় এ প্রকল্পের উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান আসাদের।

আরও পড়ুন: ৫ কোটির স্থলে সরকারের আশ্বাস ২০ লাখ, কার্যকর হয়নি সেটাও—হাইকোর্টের নির্দেশনাও উপেক্ষিত

আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, তিনি একসময় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। জামালপুর থেকে দুটি মেশিন তার এলাকায় এসে আনারসের পাতা থেকে গোখাদ্যের সাইলেজ তৈরি করা হতো। মূলত তাদের দেখেই তার উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন জাগে। ২০২৪ সালে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এসএসএস’-এর সহযোগিতায় এ কাজে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই সংস্থা থেকেই অনুদান পাওয়া ৯ লাখ টাকা খরচ করে সাইলেজ তৈরির মেশিন ক্রয় করেন। এই মেশিনের মাধ্যমে আনারসের পাতা দিয়ে পশুর খাদ্য তৈরি কার্যক্রম শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি এ প্রদ্ধতিতে তৈরি খাবার বিভিন্ন খামারিদের কাছে বিক্রি করতে থাকেন। এখন তিনি প্রতিদিন ছয় টন করে সাইলেজ তৈরি করেন। বস্তায় ভরা অবস্থায় এ সাইলেজ ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখা যায়। এ কাজে তার আট-নয়জন কর্মচারী নিযুক্ত রয়েছেন। তাদের প্রত্যেককে প্রতিদিন ৬০০ টাকা করে বেতন দেওয়া হয়।  তারা এ কাজে তাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে। খরচ বাদে এখন তার মাসিক আয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, পাতার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে আনারসের পাতা কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করা হয়। পরে বিভিন্ন  প্রদ্ধতিতে মেশিনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত সাইলেজ গরু, মহিষ, ছাগলসহ অন্যান্য গবাদিপশুর খাদ্য তৈরি করা হয়। বর্তমানে বাজারের ভুট্টার সাইলেজ প্রতি কেজি ১৫-১৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে আনারসের পাতার সাইলেজ মাত্র ৫-৬ টাকা কেজিতে প্রান্তিক খামারিদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে যখন আনারসের ফেলে দেওয়া পাতা ও গাছ থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গবাদিপশুর খাদ্য সাইলেজ তৈরি করি। তখন আমাকে সবাই পাগল হিসেবে আখ্যায়িত করে। তখন মানুষের কথায় কোনো কান না দিয়ে ভাগ্যে বদলের আশায় নতুন প্রকল্পে মনোযোগ সহকারে কাজ চালিয়ে যাই। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাকে দেখে এলাকার হুমায়ুন কবির, আব্দুল আলিমসহ অনেকে এ কাজে সম্পৃক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।’

আরও পড়ুন: এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নিয়োগ ফের ম্যানেজিং কমিটির হাতে তুলে দিল মন্ত্রণালয়

আসাদুজ্জামান আরও বলেন, পশুখাদ্যে খড় ও ঘাসের চাহিদা পূরণ করে বিধায় সাইলেজের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এটা সারা বছরই উৎপাদন করা যায়। তার উৎপাদিত সাইলেজ বর্তমানে তিনি জেলার ভুয়াপুর উপজেলার গরুর খামারি শিহাব উদ্দিন প্রতি সপ্তাহে ১০ টন এবং মধুপুরের খামারি রেজাউল করিম সপ্তাহে ৬ টন এবং নাজমুল সাদাত নোমান ১২ টন সাইলেজ ৫-৬ টাকা কেজিতে নিয়মিত বিক্রি করছেন। এ ছাড়া এ সাইলেজ ঢাকার সাভার, রংপুর, সিরাজগঞ্জ,দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন ফার্মে বিক্রি করছেন।

কর্মচারী মিঠুন মিয়া বলেন, ‘এখানে আমরা প্রতিদিন ৬ টন করে সাইলেজ তৈরি করি। আনারসের পাতা দিয়ে তৈরি গবাদিপশুর জন্য খাদ্যগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য যাচ্ছে। ১ টন খাদ্য তৈরি করতে আমাদের ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগে।’

আনারসচাষি জাহিদুল ইসলাম উজ্জল বলেন, ‘আনারসবাগান পুরোনো হওয়ার পর গুঁড়ি ওপরে আবর্জনা হিসেবে ফেলে দিতাম। এতে আমাদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হতো। সাইলেজ তৈরির মেশিন আসার পর আমাদের এখন আর অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে না। সাইলেজ উৎপাদনকারী আসাদুজ্জান আসাদ আমাদের এখন কাঠাপ্রতি টাকা দিয়ে থাকেন। এতে আমাদের কাছে এত দিন আবর্জনা হিসেবে যা বিবেচিত হতো, এখন তা থেকে বাড়তি অর্থ পাচ্ছি।’

ভুয়াপুর থেকে সাইলেজ কিনতে আসা গরুর খামারি শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘গবাদিপশুর খাবার সাইলেজ কেনার জন্য আমি এখানে এসেছি। এখানে আনারসের পাতা দিয়ে তৈরি কম দামে মান সম্মত খাদ্য সাইলেজ পাওয়া যায়। আমি তাদের এ কার্যক্রম দেখে খুব খুশি। এ সাইলেজ আমার খামারের গরুকে নিয়মিত খাওয়াচ্ছি। এতে আমার খামারের গরুর খাদ্যের ব্যয় অনেকাংশে কমে এসেছে।’

তিনি মনে করেন, স্বল্পমূল্য আনারস পাতার তৈরি এই পশুখাদ্য এর ব্যবহার বহুগুণ বাড়ানো গেলে একদিকে কৃষকদের সাশ্রয় হয়, খামারিরাও স্বল্প মূল্যে গরু বিক্রি করতে পারে। এতে গরুর মাংসের দামও কমে আসবে।

আরও পড়ুন: সিটি কলেজের ১৯৮ শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ ‘অবৈধ’

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূর মোহাম্মদ জানান, ফুলবাড়ীয়া মুক্তাগাছা মধুপুর উপজেলায় প্রতিবছর  হাজার হাজার টন আনারসের পাতা যত্রতত্রভাবে নষ্ট হয়। সেই ফেলে দেওয়া আনারসের পাতা মেশিনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে পশুর গোখাদ্য হিসেবে সাইলেজ তৈরি করা হচ্ছে, এটি আনারসচাষিদের জন্য সহায়ক। একসময় আনারসের পাতাগুলো চাষিরা আবর্জনা মনে করতেন। ক্ষেতের পাশে স্তূপ করে রাখায় অনাবাদি থাকত। এখন আর ক্ষেতের পাশে স্তূপ করে রাখতে হয় না। পরিত্যক্ত আনারসগাছ থেকে বাড়তি টাকা পেয়ে থাকেন চাষিরা।

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শরীফ আবদুল বাসেত জানান, গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে আনারস সাইলেজ অবশিষ্টাংশ পুষ্টিতে খুব সমৃদ্ধ। এ সাইলেজ গরুকে খাওয়ালে দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে আনারসের সজ্জাতে প্রচুর পরিমাণে সেলুলোজ থাকে, যা গবাদিপশু এবং ভেড়ার পরিপাকতন্ত্রকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া আনারসের অবশিষ্টাংশ অনেক প্রোটিনে সমৃদ্ধ, যা গবাদি পশুর বৃদ্ধি বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণ এবং প্রজনন দক্ষতা উন্নত করে।

তিনি আরও জানান, বাজারে যেখানে ভুট্টার সাইলেজ প্রতি কেজি ১৫-১৭ টাকা, সেখানে আনারসের পাতার সাইলেজ মাত্র ৫-৬ টাকা কেজি। এটা খামারিদের খাবারের খরচ অনেকাংশে কমে আসবে।

উল্লেখ্য, মধুপুর উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর, ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় ৬৫০ হেক্টর ও মুক্তাগাছা উপজেলায় আনারস আবাদ হয় ১৫ হেক্টর জমিতে।