০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৭

সিকৃবিতে একসঙ্গে ৯ শিক্ষক-কর্মকর্তার পদত্যাগ, নেপথ্যে কী?

পদত্যাগপত্র জমা দিচ্ছেন শিক্ষক-কর্মকর্তারা  © টিডিসি সম্পাদিত

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পাঁচ শিক্ষকসহ ৯ শিক্ষক-কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্রয়প্রক্রিয়া ও শিক্ষক নিয়োগে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রেজিস্ট্রারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তারা।

পদত্যাগকারীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি আবাসিক হলের প্রভোস্ট, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার, শরীরচর্চা শিক্ষা বিভাগের পরিচালক এবং গেস্ট হাউসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা রয়েছেন।

পদত্যাগকারী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে। এসব বিষয়ে আপত্তি জানিয়েও কার্যকর ব্যবস্থা না পাওয়ায় তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পদত্যাগকারীরা জানান, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উন্নয়ন ও নির্মাণ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে পারেনি। এতে নির্মাণ ও উন্নয়নকাজ অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। রাজস্ব খাতের অর্থে কিছু উন্নয়ন ও মেরামতকাজ হলেও এসব ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

পদত্যাগকারীরা আরও অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে টেকওভার করার আগেই সেখানে কিছু মেরামতকাজ করা হয়েছে। এসব কাজের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেও দাবি তাদের।

ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন তারা। তাদের দাবি, ইলেকট্রনিকস ও আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষক নিয়োগেও অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেছেন পদত্যাগকারী শিক্ষক-কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক আটজন শিক্ষক নিয়োগে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গ্র্যাজুয়েটদের তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রার্থীদের অধিকাংশকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও করেন তারা।

পদত্যাগকারী এক শিক্ষক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের যোগ্যতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।’

পদত্যাগকারী শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক মোজাম্মেল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’

অধ্যাপক ড. মো. কাউছার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে শিক্ষার পরিবেশ ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন।’

এদিকে পদত্যাগের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। কর্মসূচি থেকে উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, হয়রানি, নিয়োগে অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তার অপসারণ দাবি করা হয়।

আরও দেখুন: প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে পিএসসির সঙ্গে আলোচনা চলছে: প্রতিমন্ত্রী

তবে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলাম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘একটি পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অভিযোগ তুলছে। যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা যোগ্যতা সম্পন্ন।’

শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি দাবি করে উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ তদন্ত করা হলে বিষয়টি যাচাই করা যাবে বলেও জানান তিনি।

পদত্যাগের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘প্রভোস্ট ও গেস্ট হাউজ ইনচার্জসহ সাতজন শিক্ষক দুই বছরের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন শেষে নিয়ম অনুযায়ী অব্যাহতি চেয়েছেন। তারা কোনো এক্সটেনশন চাননি। চাকরির মেয়াদের সঙ্গে ভিসি পদের মেয়াদ সরাসরি সম্পর্কিত নয়। আমাকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকার চাইলে থাকব, না চাইলে চলে যাব।’

নিম্নমানের ফার্নিচার কেনা ও সংস্কারকাজে অর্থ অপচয়ের অভিযোগও অস্বীকার করেন উপাচার্য। তার দাবি, ‘মানসম্মত ব্র্যান্ডের ফার্নিচার কেনা হয়েছে। যে হিসাব নিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের। অথচ আমি দায়িত্ব নিয়েছি ২০২৪ সালের অক্টোবরে। আমি নির্ধারিত মেয়াদে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি এবং সরকার যতদিন চাইবে, ততদিন দায়িত্ব পালন করব।’