০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:১০

প্রস্তুতি শুরুর আগে সবারই অন্তত একটি মূল্যায়নমূলক পরীক্ষা দেওয়া উচিত

বুশরা লুবাবাহ  © টিডিসি সম্পাদিত

ব্যবসা ও করপোরেট দুনিয়ায় ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইবিএ হতে পারে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। তবে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (আইবিএ) ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি অন্য অনেক ভর্তি পরীক্ষার চেয়ে আলাদা। এখানে মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা, বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, যুক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা এবং অল্প সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা। সঠিক কৌশলে প্রস্তুতি শুরু করাটাই হতে পারে সাফল্যের প্রথম ধাপ।

এমনই একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর বিবিএ ৩৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী বুশরা লুবাবাহ। এইচএসসি ২০২৫ ব্যাচের এই শিক্ষার্থী আইবিএ ভর্তি পরীক্ষায় ৫৭তম স্থান অর্জন করেছেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৫২তম স্থান অর্জন করেছেন তিনি। আইবিএর প্রস্তুতি, ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্যের কৌশল এবং নিজের অভিজ্ঞতার নানা দিক নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন বুশরা লুবাবাহ

আইবিএতে পড়ার ইচ্ছা কীভাবে তৈরি হলো?
আমার বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনার প্রতি খুব একটা আগ্রহ ছিল না। তাই আমি ব্যবসায় শিক্ষার দিকে যেতে চেয়েছিলাম। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ যেহেতু বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিজনেস স্কুল, তাই শুরু থেকেই আইবিএ আমার পছন্দের জায়গা ছিল। এর পাশাপাশি আইবিএর কমিউনিটিও আমাকে অনেক আকৃষ্ট করত। এখানকার মানুষজন, সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামগ্রিক পরিবেশ ও সংস্কৃতি সবকিছুই আমার ভালো লাগত। সব মিলিয়েই আইবিএতে পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়।

আইবিএ ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কখন ও কীভাবে শুরু করেছিলেন?
আমি এইচএসসি পরীক্ষার পর থেকেই আইবিএ ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করি। প্রথমে আমি তাতহীর মিছিলে (কোচিং প্ল্যাটফর্ম) ভর্তি হই। সেখানে নিয়মিত ক্লাস করতাম এবং বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিতাম। সামগ্রিকভাবে তাতহীর ভাইয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতাম। আমাদের ওয়েবসাইটেও অনেক অনুশীলনী পরীক্ষা ছিল, সেগুলো নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টা করতাম। পাশাপাশি সাপ্তাহিক পরীক্ষাও হতো। সেগুলোতেও নিয়মিত অংশ নিতাম।

আরও পড়ুন: ভুল সিদ্ধান্তে থমকে যেতে পারে ক্যারিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে যেসব সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ

এভাবেই ধীরে ধীরে আমার প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে থাকি। পরীক্ষার সময় যতই এগিয়ে আসতে থাকে, শেষের দিকে নিয়মিত মডেল টেস্ট দেওয়া শুরু করি। এতে পরীক্ষার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের প্রস্তুতির অবস্থাটাও বুঝতে পেরেছি।

ইংরেজি ও গণিতের প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছেন?
আমি আসলে মুখস্থ করে খুব একটা পড়তে পারি না। তাই ইংরেজি ও গণিত দুটোর ক্ষেত্রেই অনুশীলনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। প্রথমে কোনো একটি বিষয়ের ক্লাস করতাম। এরপর ওই বিষয়ের বিভিন্ন প্রশ্ন বই থেকে সমাধান করতাম। কোনো প্রশ্ন ভুল হলে আবার সেটি দেখে বোঝার চেষ্টা করতাম কোথায় ভুল হয়েছে এবং কীভাবে সঠিকভাবে সমাধান করতে হয়।

এভাবে আমি অনেক প্রশ্ন অনুশীলন করেছি। পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাস, অনুশীলনী পরীক্ষা ও সাপ্তাহিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল শুধু তত্ত্ব পড়ে না থেকে যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন সমাধান করা এবং নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ঠিক করা। আমি মনে করি, এভাবেই অনুশীলন করতে করতে ধীরে ধীরে প্রস্তুতিটা শক্ত হয়েছে।

অ্যানালিটিক্যাল অংশের প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছেন?
অ্যানালিটিক্যালের জন্যও মূলত একইভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। নিয়মিত ক্লাস করেছি, বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন সমাধান করেছি এবং অনুশীলনী ও সাপ্তাহিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। তবে ব্যক্তিগতভাবে অ্যানালিটিক্যাল আমার কাছে সবচেয়ে মজার একটি অংশ ছিল। বিশেষ করে অ্যানালিটিক্যাল পাজল সমাধান করতে আমার অনেক ভালো লাগত। তাই এই অংশের প্রস্তুতি নিতে আমার খুব একটা একঘেয়ে লাগত না। বরং বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করার বিষয়টি আমি উপভোগ করতাম।

প্রস্তুতির জন্য কোন বই বা রিসোর্স ব্যবহার করেছেন?
যেহেতু পুরো প্রস্তুতির সময় আমি কোচিং করেছি। মূলত ‘ওয়ার্ড স্মার্ট’ ও ‘দ্য আইবিএ বুক’ ব্যবহার করেছি। দুটির মধ্যে তুলনা করলে আমার কাছে ‘দ্য আইবিএ বুক’ বেশি উপকারী মনে হয়েছে। এর পাশাপাশি তাতহীর মিছিলের (কোচিং প্ল্যাটফর্ম) নিয়মিত ক্লাস, ওয়েবসাইটের অনুশীলনী পরীক্ষা এবং সাপ্তাহিক পরীক্ষাগুলোও আমার প্রস্তুতিতে অনেক সাহায্য করেছে।

প্রস্তুতির সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা। কোনো কোনো পরীক্ষায় যখন একটু খারাপ করতাম, তখন আমার আত্মবিশ্বাস অনেকটাই কমে যেত। মাঝে মাঝে মনে হতো, হয়তো আমার প্রস্তুতি ঠিকভাবে হচ্ছে না।

শেষের দিকে গিয়ে লিখিত অংশ নিয়েও কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ভয় হতো, হয়তো লিখিত পরীক্ষায় আলাদাভাবে পাস করতে পারব না কিংবা সেখানে প্রত্যাশামতো ভালো করতে পারব না। যদিও সামগ্রিকভাবে আমার ভর্তি পরীক্ষার সময়টা খুব একটা খারাপ ছিল না এবং ফলাফলও মোটামুটি ভালোই হয়েছিল। তারপরও মাঝেমধ্যে কোনো পরীক্ষায় খারাপ করা এবং লিখিত অংশ নিয়ে অনিশ্চয়তাই আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

আইবিএতে পড়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা কী মনে হয়?
আমার কাছে আইবিএতে পড়ার সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো এখানকার কমিউনিটি ও সামগ্রিক পরিবেশ। আইবিএর মানুষজন, সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পুরো পরিবেশটাই আমার অনেক ভালো লাগে। পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ বিজনেস স্কুল হিসেবে আইবিএতে ব্যবসায় শিক্ষা ও করপোরেট জগতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার খুব ভালো একটি পরিবেশ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন, নীলার ছয় বছরের লড়াই আর একটি থিসিস ডিফেন্সের গল্প

আইবিএতে ভর্তি হতে আগ্রহীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
প্রথমত, আইবিএর প্রস্তুতিকে সহজভাবে নেওয়া যাবে না। প্রতিবছর আসন সংখ্যা সীমিত থাকে এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা অনেক বেশি হয়। তাই শুরু থেকেই প্রস্তুতিটাকে গুরুত্ব দিয়ে নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অনেক বেশি রিসোর্স ব্যবহার করে সবকিছু শেষ করার চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। আইবিএতে কমন পড়ার বিষয়টি অন্য অনেক ভর্তি পরীক্ষার মতো নয়। তাই অসংখ্য রিসোর্স শেষ করার চেয়ে নিজের মৌলিক ধারণাগুলো ঠিক আছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ধারণাগুলো ভালোভাবে বুঝে প্রশ্ন সমাধান করা এবং কোথায় ভুল হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সংশোধনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

তৃতীয়ত, প্রস্তুতি শুরু করার আগে অন্তত একটি মূল্যায়নমূলক পরীক্ষা দেওয়া উচিত। কারণ আইবিএ মূলত একটি অ্যাপটিটিউড টেস্ট। এই পরীক্ষার জন্য যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, সেগুলো নিজের মধ্যে কোন পর্যায়ে আছে, শুরুতেই তা বোঝা দরকার।

আমার মনে হয়, আইবিএর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা মাত্র তিন-চার মাসের প্রস্তুতিতে শূন্য থেকে তৈরি করা সম্ভব নয়। ছোটবেলা থেকে যে মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতাগুলো তৈরি হয়েছে, ভর্তি পরীক্ষায় সেগুলোই বিভিন্নভাবে কাজে লাগে। প্রস্তুতির কয়েক মাস মূলত সেই দক্ষতাগুলোকে আরও ঝালিয়ে নেওয়া ও শাণিত করার সময়।

তাই প্রস্তুতি শুরু করার আগে একটি মূল্যায়নমূলক পরীক্ষা দিয়ে নিজের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া আমার মতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে নিজের দুর্বলতা ও শক্তির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী প্রস্তুতির পরিকল্পনা করা সহজ হয়।