১৭ মে ২০২৬, ১১:৫১

এসএসসি-এইচএসসি এগিয়ে আসছে দুই মাস—উদ্বেগ বাড়ছে শিক্ষার্থীদের, বোর্ডগুলোও চাপে

পরীক্ষার্থীকে শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করছেন অভিভাবক  © টিডিসি ফটো

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি কয়েক মাস এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে শিক্ষাবর্ষ শুরুর পরও সময়মতো পাঠ্যবই না পাওয়া, মাঝপথে কারিকুলামে পরিবর্তন এবং বিভিন্ন ছুটি ও কর্মসূচির কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা হয়েছে। এদিকে শিক্ষক ও অভিভাবকদের একাংশের অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত না করেই শিক্ষার্থীদের ওপর দ্রুত পরীক্ষার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল।

ডিসেম্বরে শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ার কথা। তাই এরপর যেকোনো সময় পরীক্ষা নেওয়া স্বাভাবিক। এতে শিক্ষার্থীদের সমস্যার কোনো কারণ দেখি না। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পূর্ণ দুই বছর সময়ই পেয়েছে অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।

কী বলছেন শিক্ষামন্ত্রী
সম্প্রতি সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, আগামী বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে আগামী ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৬ জুন। এ সময় পরীক্ষাগুলোর প্রস্তাবিত রুটিনও প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো এসএসসি এবং এইচএসসি উভয় পরীক্ষাই প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে আয়োজন করা। আমাদের লক্ষ্য হলো ক্রমান্বয়ে গ্যাপ কমিয়ে আনা। ডিসেম্বরকে আমরা পরীক্ষার জন্য আদর্শ মাস হিসেবে নির্ধারণ করেছি এবং সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে।’

আরো পড়ুন: বিনামূল্যে শিক্ষার মেয়াদে গোটা বিশ্বে সবার নিচে বাংলাদেশ

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সেশনজটের কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে অনেক শিক্ষার্থীর ২০ বছর বয়স হয়ে যাচ্ছে, যা জাতীয়ভাবে জনমিতির বড় ক্ষতি। প্রাথমিকভাবে আগামী বছর থেকেই পরীক্ষা ডিসেম্বরে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শিক্ষার্থী ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের তুলনায় তিন মাসের বেশি সময় আগেই আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় বসতে হবে শিক্ষার্থীদের।

বোর্ড যা বলছে
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ডিসেম্বরে শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ার কথা। তাই এরপর যেকোনো সময় পরীক্ষা নেওয়া স্বাভাবিক। এতে শিক্ষার্থীদের সমস্যার কোনো কারণ দেখি না। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পূর্ণ দুই বছর সময়ই পেয়েছে।

গত ২০ বছরে করোনাকাল ছাড়া পরীক্ষার সূচিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। করোনার কারণে টানা দুই বছর পরীক্ষা পিছিয়ে গিয়েছিল। এর বাইরে সব সময়ই পরীক্ষা ফেব্রুয়ারি বা মার্চের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এবার শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, গত বছর বই বিতরণ ও শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে দেরি হওয়ায় তারা পর্যাপ্ত সময় পায়নি। সে কারণেই পরীক্ষা জুনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মূলত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্বার্থেই পরীক্ষার সময় আরও দুই মাস বাড়ানো হয়েছে।

অভিভাবকদের অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ বিষয়ে আয়োজিত বৈঠকে মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অনলাইনে সারা দেশ থেকে ৭০০ শতাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকও যুক্ত ছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বোর্ডের চেয়ারম্যান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘সরকার যদি পরীক্ষা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমাদের সেইভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষা, প্রশ্ন ও উত্তরপত্র তৈরিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া এই সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো প্রতিটি সম্পন্ন করতে এক থেকে দেড় মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সময় দুই মাস এগিয়ে এলে আমাদের আরও স্বল্প সময়ে তা সম্পন্ন করতে হবে। এটি বোর্ডের বিদ্যমান জনবলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এরপরও সরকার সিদ্ধান্ত নিলে আমরা তা যথাসময়ে সম্পন্ন করার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাব।’

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন ভিন্ন কথা
রাজধানীর একটি স্কুলে অধ্যয়নরত আসিফ নামের এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলে, ‘সাধারণত এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারি বা মার্চে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এবার পরীক্ষা প্রায় দুই মাস এগিয়ে আনা হয়েছে। এতে আমাদের পড়াশোনার প্রস্তুতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। আমাদের আগের দুটি ব্যাচ শর্ট সিলেবাসে পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু আমরা পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা দেব। অথচ সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখনো সিলেবাস কমানো হবে কি না বা কোন অংশ বাদ যাবে, সেটিও স্পষ্ট করা হয়নি। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’

ওই শিক্ষার্থী আরও বলে, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, স্কুলে যেসব অধ্যায় পড়ানো হয়েছে, সেগুলো হয়তো পরে বাদ দেওয়া হতে পারে। আবার যেসব অংশ এখনো পড়ানো হয়নি, সেগুলো পরীক্ষায় থেকে যেতে পারে। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।’

আরও পড়ুন: আগামীতে এইচএসসি ও ভর্তি পরীক্ষার মাঝে কোনো গ্যাপ থাকবে না

ঢাকার বাইরের একটি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মীম বলেন, ‘ক্লাস টেনে ওঠার পর এসিটি, প্রি-টেস্ট, টেস্ট ও মডেল টেস্টসহ বিভিন্ন পরীক্ষার চাপ থাকে। এর মধ্যেই সিলেবাস শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা ভেবেছিলাম, হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকবে। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্তে সেই সুযোগ কমে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকদেরও নির্ধারিত সময়ের আগেই সিলেবাস শেষ করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অল্প কয়েকটি ক্লাস নিয়েই একটি অধ্যায় শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলোতে এটি বেশি হচ্ছে। যেখানে একটি অধ্যায় শেষ করতে আট-নয়টি ক্লাস লাগার কথা, সেখানে চার-পাঁচটি ক্লাসেই শেষ করা হচ্ছে। আমরা সিলেবাস কমানোর দাবি করছি না। আমরা চাই, আগের নিয়ম অনুযায়ী রোজার পর মার্চ বা এপ্রিলের দিকে পরীক্ষা নেওয়া হোক, যাতে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় পায়।’