২৭ মে ২০২৬, ১৮:১৩

বিদেশে শিক্ষার্থীদের ঈদ: বাইরে থেকে জীবন যতটা সহজ মনে হয়, ভেতরে ততটাই একাকিত্ব

বিদেশে পড়তে যাওয়া ৪ শিক্ষার্থীর ঈদ অনুভতি  © টিডিসি ফটো

ঈদ মানেই আনন্দ, পরিবার আর আপন মানুষদের সঙ্গে একসাথে কাটানো বিশেষ কিছু মুহূর্ত। ছোটোবেলার ঈদে ছিল ভোরবেলার ব্যস্ততা, নতুন পোশাকের গন্ধ, ঈদগাহ থেকে বাবার ফেরা, মায়ের রান্নাঘরের ব্যস্ততা আর আত্মীয়স্বজনের কোলাহল। কিন্তু উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে দেশ ছাড়ার পর সেই চিরচেনা ঈদের রং অনেক শিক্ষার্থীর জীবনেই বদলে গেছে।

এখন তাদের ঈদ কাটে ভিনদেশের ব্যস্ত শহরে, ক্লাস-অ্যাসাইনমেন্টের ফাঁকে কিংবা নির্জন কোনো ডরমিটরির ঘরে। পরিবারের সঙ্গে দেখা হয় শুধু মোবাইলের স্ক্রিনে। তবুও এই দূরত্ব আর একাকিত্ব অনুভূতির মাঝেও তারা থেমে নেই। ভবিষ্যতের স্বপ্নই তাদের এগিয়ে চলার শক্তি জোগাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা এমন কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ঈদের অনুভূতির কথা শুনেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের ডিআইইউ প্রতিনিধি নুর ইসলাম।

ঈদের দিনে শূন্যতাটা আরও বেশি অনুভূত হয়
চীনের Xi'an Jiaotong University-এ ইকোনমিকসে মাস্টার্স করছেন শহিদুজ্জামান সেলিম। তার কাছে ঈদ মানেই ছিল পরিবারের সঙ্গে সকাল শুরু করা, ঈদের নামাজ শেষে ঘরে ফেরা আর মায়ের হাতের রান্নার উষ্ণতা।

তিনি বলেন, দেশের বাইরে আসার পর ঈদের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন ঈদ মানেই স্ক্রিনের ওপারে প্রিয়জনদের দেখা, আর চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা অনুভব করা। পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে দেখলে আনন্দের পাশাপাশি এক ধরনের গভীর শূন্যতাও কাজ করে।

তার মতে, উন্নত শিক্ষা আর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আমরা পরিবার, বন্ধু আর পরিচিত জীবন ছেড়ে দূরে এসেছি। বাইরে থেকে এই জীবন যতটা সহজ মনে হয়, ভেতরে ততটাই আবেগ আর একাকিত্বে ভরা।

সবকিছু আছে, তবুও যেন কিছু একটা নেই
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড ইকোনোমিকসে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তামান্না সুলতানার কাছেও এবার দেশের বাইরে দ্বিতীয় ঈদ। এসএসসির পর থেকে বাড়ির বাইরে থাকলেও ঈদের আগেই বাড়ি ফেরার সুযোগ হতো। তাই ঈদের কথা ভাবলেই এখনও চোখে ভেসে ওঠে পরিবারের সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট আনন্দময় মুহূর্তগুলো।

তিনি বলেন, বিদেশে ঈদের দিনে আলাদা কোনো উৎসবমুখর পরিবেশ বা আমেজ থাকে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে যাওয়া, নিজের খাবার নিজে তৈরি করা- সবকিছুই যেন অন্য সাধারণ দিনের মতো। ভিডিওকলে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া গেলেও পরিচিত মুখগুলোকে ছুঁতে না পারার কষ্ট থেকেই যায়।

তামান্না বলেন, চারপাশে মানুষ থাকলেও ভিড়ের মাঝেও এক ধরনের নির্জনতা কাজ করে। সবকিছুই আছে, তবুও যেন কিছু একটা নেই- যেটার নাম ‘বাড়ি’।

তবে এবারের ঈদ কিছুটা ভিন্নভাবে কাটবে বলেও জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডে-ট্যুর ঈদের দিনেই পড়েছে, তাই একাকিত্বের মাঝেও দিনটি একটু অন্যরকমভাবে কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিদেশে থেকেও মনে হয় না পরিবার থেকে দূরে আছি
চীনের Chengdu University of Technology- তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মাস্টার্স করছেন রিফাত মিয়া। তার কাছে এবারের ঈদ বিশেষ, কারণ প্রথমবারের মতো ভিনদেশি বন্ধুদের সঙ্গে চীনে ঈদ উদ্‌যাপন করবেন।
তিনি বলেন, বিদেশে এসে তিনি অনেক ভালো বন্ধু পেয়েছেন। এখানকার আন্তরিক পরিবেশের কারণে অনেক সময় মনেই হয় না তিনি পরিবার থেকে দূরে আছেন। তবে মাকে হারানোর কষ্ট এখনও তাকে নাড়া দেয়। বাবাকে পাশে পেলে আনন্দটা আরও পূর্ণ হতো বলেও জানান তিনি।

রিফাত বলেন, আশা করি আগামী ঈদে বাবাকে এখানে নিয়ে আসতে পারবো। একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশের সব মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রতি ঈদের শুভেচ্ছা জানান।

মনটা আজও বাংলাদেশের ঈদের অপেক্ষায়
রাশিয়ার Voronezh State University of Forestry and Technologies-তে পর্যটন ও আতিথেয়তা বিভাগে অধ্যয়নরত তাওহীদ হাসান নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন আবেগঘন কিছু কথায়।

তিনি বলেন, বিদেশে থাকলেও মন পড়ে থাকে দেশের বাড়ির উঠোনে। ঈদের আনন্দ এখন খুঁজে নিতে হয় মোবাইলের স্ক্রিনে। মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ, পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর অনুভূতি, সবই যেন স্মৃতির ভেতর বন্দি হয়ে আছে। তার মতে, দূরত্ব শরীরকে আলাদা করে, কিন্তু মনকে নয়। তাই আমার মনটা আজও বাংলাদেশেই, ঈদের অপেক্ষায়।’

উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জীবন শুধু নতুন স্বপ্নের নয়, বরং অসংখ্য ত্যাগ, আবেগ আর নীরব সংগ্রামের গল্প। ঈদের মতো উৎসবের দিনে পরিবার থেকে দূরে থাকা সহজ নয়। তবুও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা, পরিবারকে ভালো রাখা এবং দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্নই তাদের এগিয়ে চলার সাহস জোগায়।

হয়ত এই ঈদে তারা পরিবারের পাশে নেই, কিন্তু তাদের প্রতিটি ত্যাগের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আগামীর সম্ভাবনা। দূরত্ব যতই বাড়ুক, ভালোবাসা আর স্বপ্ন ঠিকই মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে শেখায়।