ফিলিস্তিন প্রশ্নে—নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের পার্থক্য কতটা?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকটের নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিতে বেশ কিছু মিল রয়েছে। দুজনই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকানো এবং হামাসসহ ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা দুর্বল করার পক্ষে। তবে গাজা যুদ্ধ পরিচালনা, ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন এবং আঞ্চলিক কূটনীতি নিয়ে তাদের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধের পরিণতি ও রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নে নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করেছেন আইজেনকট।
নানা নাটকীয়তার পর ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশ কাটিয়ে তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। আইজেনকট মিজরাহি বংশোদ্ভূত একজন অভিবাসী।
বহু বছর ধরে মিজরাহি ভোটারদের বড় একটি অংশ ঐতিহ্যগতভাবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে সমর্থন দিয়ে আসছেন। ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকট মরক্কো থেকে ইসরায়েলে পাড়ি জমানো অভিবাসীদের সন্তান। তিনি ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা হয়েছিলেন। দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে তিবেরিয়াস ও ইলাতে তার বেড়ে ওঠা।
আইজেনকট খুব কমই নিজের জাতিগত পরিচয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, তার জনপ্রিয়তার পেছনে এই পরিচয়ের ভূমিকা রয়েছে। ইসরায়েলে এখন পর্যন্ত কোনো মিজরাহি প্রধানমন্ত্রী হননি। আইজেনকট সরকার গঠন করলে সেটি হবে প্রথম ঘটনা।
কে এই গাদি আইজেনকট?
আইজেনকট ৯ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় এবং পাঁচ সন্তানের জনক। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) জীবনের অধিকাংশ সময় কাটানোর পর রাজনীতিতে আসেন তিনি।
১৯৭৮ সালে তিনি গোলানি ব্রিগেডে যোগ দেন। এরপর ৪০ বছরের সামরিক জীবনে ধাপে ধাপে উন্নতি করে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করেন।
তার দায়িত্ব পালনকালে ইসরায়েলের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত একটি ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালে হেবরনে আহত এক ফিলিস্তিনি হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করেন ইসরায়েলি সেনাসদস্য সার্জেন্ট এলর আজারিয়া। নেতানিয়াহুসহ ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের চাপ থাকা সত্ত্বেও আইজেনকট সামরিক তদন্ত ও বিচারের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা রক্ষার স্বার্থেই তিনি এ অবস্থান নিয়েছেন।
২০২২ সালে আরেক সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজের সঙ্গে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর তারা দুজনই নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবের কথা উল্লেখ করে ২০২৪ সালের জুনে তারা মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসেন।
যুদ্ধের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে আইজেনকটের পরিবারকেও। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুদ্ধের দ্বিতীয় মাসে গাজায় লড়াই করতে গিয়ে তার ২৫ বছর বয়সী ছোট ছেলে গাল নিহত হন। তার দুই ভাতিজাও যুদ্ধে প্রাণ হারান।
গত এপ্রিলে সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথে লেখা এক নিবন্ধে আইজেনকট বলেন, ‘গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে এবং তার বন্ধুরা যে মূল্য দিয়েছে, যাদের সে চিনত এবং যাদের চিনত না, তাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেব না।’ তিনি এই প্রতিশ্রুতিকে নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্যের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সামরিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত আইজেনকট চরিত্র, আচরণ ও মেজাজের দিক থেকে নেতানিয়াহুর চেয়ে আলাদা। তার দলের নাম ‘ইয়াশার’। হিব্রু ভাষায় শব্দটির অর্থ ‘সোজা’ বা ‘সঠিক’। ৭ অক্টোবরের হামলার সময় জিম্মি হওয়া এলি শারাবির একটি বক্তব্য থেকে দলটির নামের অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে। তার বক্তব্য ছিল, ‘এটি ডানপন্থী নয়, বামপন্থীও নয়, এটি সোজা পথ।’
নিরাপত্তার প্রশ্নে আইজেনকট কঠোর অবস্থানের সমর্থক। এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার অনেক নীতির মিল রয়েছে। নেতানিয়াহুর প্রায় সব প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো তিনিও গাজা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে আইজেনকট ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই নীতির আওতায় ভবিষ্যতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা প্রতিরোধে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের কথা বলা হয়।
এ ছাড়া ‘ক্যাম্পেইন বিটুইন ওয়ারস’ বা দুই যুদ্ধের মধ্যবর্তী অভিযান কৌশলের সঙ্গেও তিনি যুক্ত। এটি এমন একটি কৌশল, যার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু না করেই গোপন ও সীমিত মাত্রার সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়।
ইরানের বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের মূল লক্ষ্যগুলোর মিল রয়েছে। উভয়েই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং তেহরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক দুর্বল করার পক্ষে।
তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কৌশলের অভাব নিয়ে সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। তার মতে, সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও থাকতে হবে।
গাজা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। শেষ পর্যন্ত এই অভিযোগই তাকে যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা ছাড়তে প্রভাবিত করে।
ফিলিস্তিনিদের জন্য তার নীতি কেমন হতে পারে?
গাজার বিষয়ে আইজেনকট ১৮ মাসের মধ্যে হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ জন্য তিনি ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অথবা তার ভাষায় ‘সৃজনশীল’ সামরিক অভিযান পরিচালনার কথা বলেছেন।
বাস্তবে নেতানিয়াহুর ঘোষিত লক্ষ্যও মোটামুটি একই রকম। তবে আইজেনকটের যুক্তি, ‘নেতানিয়াহু যত দিন ক্ষমতায় থাকবেন, তত দিন হামাস ক্ষমতায় থাকবে।’
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে আইজেনকট সতর্ক করেছিলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে দ্বিজাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি এটিকে ‘ইহুদিবাদী স্বপ্নের সমাপ্তি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
তবে ৭ অক্টোবরের পর থেকে তিনি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করে আসছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, যারা এখনো দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে কথা বলেন, তারা ‘ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে রয়েছেন’। তবে এর বিকল্প হিসেবে তিনি কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরেননি।
তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করা এবং সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপনের বিরোধিতা করেন। পশ্চিম তীরের বিতর্কিত ই১ এলাকায় বসতি নির্মাণের ইসরায়েলি সরকারের পরিকল্পনাকে তিনি ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে মূল্য দিতে হবে।
এ ছাড়া বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি যেটিকে স্পষ্টভাবে ‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। তার অভিযোগ, ইসরায়েল সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর হাত বেঁধে রেখেছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে আইজেনকটের সম্পর্ক কেমন হবে?
ট্রাম্প তার পছন্দের বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। অক্টোবরের শুরুর দিকে তিনি নেতানিয়াহুকে ‘সম্পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন’ জানান এবং তাকে ‘একজন মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ বলে অভিহিত করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে সেটি হবে ‘ভুল নেতা’। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে একাই ইরানের মোকাবিলা করতে হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আইজেনকট ও বিরোধী দলের অন্য নেতারা রিপাবলিকান দলের বড় দাতা মরিয়ম অ্যাডেলসনসহ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তাতে কাজ হয়নি।
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০১৭ সালে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, ২০১৮ সালে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসা, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এবং ২০২৫-২০২৬ সালে ইরানে হামলার মতো বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক রাভিদ যখন ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি কাজ করতে পারবেন কি না, তখন ট্রাম্প উত্তর দেন, ‘হয়তো পারব, হয়তো পারব না। কে এই ঝুঁকি নিতে চায়?’
তবে গত এক বছরে নেতানিয়াহু এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের অন্য সদস্যদের ক্ষুব্ধ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে লেবানন ও গাজায় ইসরায়েলি হামলা, যা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী মিত্র ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচকে ছাড়া আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে সেটি তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী হতে পারে। এতে আঞ্চলিক কূটনীতি এগিয়ে নিতে ট্রাম্পের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিও রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।