৯৩ বছর বয়সে মারা গেলেন আজাদ কাশ্মীরের সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজা জুলকারনাইন খান
পাকিস্তানশাসিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের (এজেকে) সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজা মোহাম্মদ জুলকারনাইন খান মারা গেছেন। শনিবার (৭ নভেম্বর) ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে অল্প সময়ের অসুস্থতার পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৯৩ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট। তাঁর মৃত্যুতে রবিবার (৮ নভেম্বর) এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে আজাদ কাশ্মীর সরকার।
রাষ্ট্রীয় শোক পালনের অংশ হিসেবে এদিন রাজ্যের সব সরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। ভিম্বার জেলার নিজ শহর কাসগুমায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফনের আয়োজন করা হয়। সকাল ১১টায় জানাজার পর তাঁকে দাফন করার কথা ছিল।
১৯৩৩ সালের ১৫ মার্চ জন্ম নেওয়া রাজা জুলকারনাইন খানের বাবা খান বাহাদুর রাজা মোহাম্মদ আফজাল খান ছিলেন ব্রিটিশ আমলের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের (আইসিএস) কর্মকর্তা। তিনি মহারাজা হরি সিংয়ের প্রশাসনেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
জুলকারনাইন খান শ্রীনগর ও দিল্লিতে প্রাথমিক পড়াশোনা করেন। ১৩ বছর বয়সে ভর্তি হন ঘোরা গালির লরেন্স কলেজে। পরে লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে ১৯৫৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে করাচিতে ইউনাইটেড বিল্ডার্স নামে নির্মাণপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান, আজাদ কাশ্মীর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে প্রতিষ্ঠানটি।
রাজনৈতিক জীবন
১৯৬০-৬১ সালে আজাদ কাশ্মীরের সাবেক প্রেসিডেন্ট কে এইচ খুরশিদের সহযোগী হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হন জুলকারনাইন খান। কে এইচ খুরশিদ ছিলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একান্ত সচিব।
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের প্রবর্তিত বেসিক ডেমোক্রেসি ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে নিজ এলাকার কাসগুমা ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৬২ সালে কে এইচ খুরশিদ জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন লিগ প্রতিষ্ঠা করলে জুলকারনাইন খান সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হন।
১৯৭৫ সালে আজাদ কাশ্মীরে প্রথম সংসদীয় পদ্ধতির সাধারণ নির্বাচনের আগে পাকিস্তান পিপলস পার্টিতে (পিপিপি) যোগ দেন তিনি। ওই নির্বাচনে সামাহনি আসন থেকে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। পরে সামরিক শাসনামলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় শুরু হলে তিনি মুসলিম কনফারেন্সে যোগ দেন। ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে দলটির প্রার্থী হিসেবে ভিম্বার থেকে জয়ী হন। এরপর সর্দার সিকান্দার হায়াতের মন্ত্রিসভায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯০ সালের নির্বাচনে পিপিপির প্রার্থী চৌধুরী সোহবত আলীর কাছে পরাজিত হন জুলকারনাইন খান। ১৯৯১ সালে আবার আইনসভায় ফেরেন এবং সর্দার আবদুল কাইয়ুম খানের মন্ত্রিসভায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে তাঁকে আজাদ কাশ্মীর কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত করা হয়।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি চৌধুরী তারিক ফারুককে সমর্থন করেন। ওই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আইনসভার সদস্য হন তারিক ফারুক। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জুলকারনাইন খানকে পরাজিত করেন তারিক ফারুক।
২০০৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম কনফারেন্সের প্রার্থী তারিক ফারুকের বিরোধিতা করেন জুলকারনাইন খান। তাঁর সমর্থনে চৌধুরী আনোয়ারুল হক অল্প ব্যবধানে প্রথমবারের মতো আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরের আগস্টে মুসলিম কনফারেন্স তাঁকে আজাদ কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। ২০১১ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার পরও আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০১১ ও ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি আনোয়ারুল হককে সমর্থন দেন। তবে দুই নির্বাচনেই চৌধুরী তারিক ফারুক জয়ী হন। ২০২১ সালের নির্বাচনে পিটিআইয়ের প্রার্থী আনোয়ারুল হককে সমর্থন দেন জুলকারনাইন খান। ওই নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো জয়ী হন আনোয়ারুল হক। পরে তাঁর সঙ্গে জুলকারনাইন খানের রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়।
চলতি বছরের এপ্রিলে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) একটি প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে দেখা করে দলটিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। পরের মাসে ভিম্বারে এক জনসভায় তাঁর ছেলে বাবর আলী জুলকারনাইন বাবার পিএমএল-এনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। পরে তাঁকে দলটির ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়।
তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন আজাদ কাশ্মীর আইনসভার স্পিকার চৌধুরী তারিক ফারুক। শোকবার্তায় তিনি বলেন, জুলকারনাইন খানের মৃত্যু জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক, সংসদীয় ও সামাজিক অঙ্গনের জন্য বড় ক্ষতি।
এ ছাড়া আজাদ কাশ্মীরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সর্দার তানভীর ইলিয়াসও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।
সূত্র: ডন