০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২০:১৮

নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট পুনর্দখলের সময় এসেছে: বিজেপির সংসদ সদস্য

ঝাড়খন্ড বিজেপির সংসদ নিশিকান্ত দুবে  © সংগৃহীত

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চল পুনরুদ্ধারের দাবি তুলেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির ঝাড়খণ্ডের সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে। তার দাবি, স্বাধীনতার সময় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এসব অঞ্চল হস্তান্তর করেছিলেন। এবার পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের পাশাপাশি ওই তিনটি অঞ্চলও ভারতের পুনরুদ্ধার করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তার এ বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে বিতর্কের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) এক সাক্ষাৎকারে নিশিকান্ত দুবে বলেন, ‘আমার মতে, পাকিস্তানের কাছ থেকে শুধু পাক-অধিকৃত কাশ্মীর পুনরুদ্ধার করার সময়ই আসেনি, নেহরুজি জোর করে যে অঞ্চলগুলো হস্তান্তর করেছিলেন, সেগুলোও পুনরুদ্ধারের সময় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর ও সিলেট।’

তিনি আরও বলেন, ‘নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রাম বন্দর—এই তিনটি অঞ্চল ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ ছিল। ত্রিপুরা আগে তিপ্রা নামে পরিচিত ছিল। সেখানকার রাজা বীরবিক্রম সিংহ ধারাবাহিকভাবে নেহরুর নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি নেহরুকে প্রশ্ন করেছিলেন, কীভাবে আপনি আমাদের ভূখণ্ড নিয়ে আলোচনা করতে পারেন? কীভাবে আপনি নোয়াখালী পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে পারেন? কীভাবে সিলেটে গণভোট করাতে পারেন? কীভাবে চট্টগ্রামে গণভোট করাতে পারেন?’

বিজেপির এই সাংসদের ভাষ্য, ত্রিপুরার রাজা বীরবিক্রম সিংহ সে সময় নেহরুকে বলেছিলেন, ‘এটি আমার রাজ্য। এটি ভারতের অংশ থাকবে, পাকিস্তানের অংশ হবে, না কি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে—সেই সিদ্ধান্ত আমি নেব। কিন্তু তা মানা হয়নি।’

নিশিকান্তের দাবি, স্বাধীন ভারতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন বলেই শেষ পর্যন্ত ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ত্রিপুরা ভারতের অংশ হয়েছিল।

নেহরুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। নিশিকান্ত বলেন, ‘১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয়েছিল, কিন্তু তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী হননি। তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর।’ তবে ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর নেহরু অন্তর্বর্তী সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন।

নেহরু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মুসলিম লীগকে তার সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সক্রিয় হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন ঝাড়খণ্ডের গোড্ডার এই বিজেপি সাংসদ। তার অভিযোগ, এ কারণেই ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে নোয়াখালীতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজ নিতে যাননি নেহরু।

ভারতভাগের সময় চট্টগ্রাম বন্দর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে যাওয়ায় উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন নিশিকান্ত। তিনি বলেন, ‘আজ যদি উত্তর-পূর্ব ভারতকে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল বলে মনে হয়, যদি সেখানকার খনিজ সম্পদ ও গ্যাসের সদ্ব্যবহার করা না যায়, যদি এখনও বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে থাকে, তার একমাত্র কারণ হলো—ভারতের কাছে আর সেই বন্দর নেই। এখন চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও সিলেট পুনরুদ্ধার করার সময় এসেছে।’

অবশ্য এবারই নয়, এর আগেও বিতর্কিত কয়েকটি বিষয়ে তার নাম সামনে এসেছিল। প্রায় দুই বছর আগে ভারতের লোকসভায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের কয়েকটি অঞ্চল নিয়ে নতুন একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠনের দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। তার দাবি ছিল, মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং বিহারের কিষাণগঞ্জ ও কাটিহার এলাকায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের কারণে জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে।

এ ছাড়া কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে তার বিদেশযাত্রার অনুমতি বাতিলের দাবি, ভারতের বিচারব্যবস্থা ও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগও রয়েছে এই বিজেপি সাংসদের বিরুদ্ধে।

দেওঘর বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল কক্ষে ঢুকে কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে রাতে চার্টার্ড বিমানের উড্ডয়নের অনুমতি আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় ঝাড়খণ্ডের জামতাড়ায় বিজেপির এক সভায় শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনাদের অনুরোধ, বিজেপি প্রার্থী চোর-ডাকাত বা দুষ্ট লোক হলেও তাকে সমর্থন করুন।’

এ ছাড়া নিশিকান্ত দুবের অভিযোগের ভিত্তিতেই ২০২৩ সালে সংসদের এথিক্স কমিটি তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক সাংসদ মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিল। শিল্পপতি দর্শন হীরানন্দানির কাছ থেকে উপহার ও অর্থের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন করার অভিযোগে ওই তদন্ত হয়। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সে সময় মহুয়ার সাংসদ পদ খারিজ করা হয়েছিল।