কংগ্রেসে ধাক্কা খেলেও পররাষ্ট্রনীতিতে কমেনি ট্রাম্পের আধিপত্য
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপে পড়লেও পররাষ্ট্রনীতিতে তার ক্ষমতা খুব একটা কমছে না। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা ইরান যুদ্ধ বন্ধ, ইউক্রেনকে সহায়তা এবং ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার নীতিতে পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সামরিক অভিযান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনায় ট্রাম্পের হাতে বিস্তর ক্ষমতা থাকায় এসব উদ্যোগে বড় বাধার মুখে পড়তে পারে ডেমোক্র্যাটদের দল। খবর রয়টার্সের।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, নির্বাচনে দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও অভ্যন্তরীণ নীতিতে চাপ বাড়বে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তিনি ব্যাপক স্বাধীনতা ভোগ করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পকে পররাষ্ট্রনীতিতে সতর্ক করবে, নাকি নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠায় আরও আক্রমণাত্মক করে তুলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে তাঁর পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।
আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ পরিচালক উইলিয়াম ওয়েচসলার জানিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের কর্মসূচি আটকে দিতে পারলেও প্রেসিডেন্ট ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ ঠেকানোর সুযোগ সীমিত।
ইরান যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে অসন্তোষ বাড়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আট মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের কারণে দেশটিতে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় প্রভাব পড়েছে। নির্বাচনের ফলাফলকে ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প অবশ্য ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই বলে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে জন্য সামরিক অভিযান প্রয়োজন ছিল। যদিও তেহরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ডেমোক্র্যাটদের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হবে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো। সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেছেন, দেশে ও বিদেশে ট্রাম্পের নীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধ করাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে বিশ্লেষক সিনা তৌসি মনে করছেন, ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালালে বিজয়ের কোনো সুস্পষ্ট পথ তৈরি হবে না। বরং এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠী ‘মাগা’ আন্দোলনের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়তে পারে।
এদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইরান নীতি নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করেছেন। বুধবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই যুদ্ধের ব্যয় বহন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা যৌক্তিক। রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্যও তিনি ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেন।
ইউক্রেন ও ইসরায়েল নীতিতেও চাপ বাড়বে
আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পুনরায় বাড়ানোর চেষ্টা করবে ডেমোক্র্যাটরা। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন চাপ তৈরি করেছে। সরাসরি সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছেন ট্রাম্প।
ডেমোক্র্যাটরা আশা করছেন, ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা অনুমোদনে রিপাবলিকানদের একটি অংশকেও পাশে পাওয়া যাবে। এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করতে চান তাঁরা, যাতে ট্রাম্প ভেটো দিলেও কংগ্রেসে প্রস্তাবটি পাস করানো সম্ভব হয়।
রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় ট্রাম্পের সমালোচনা হয়েছে। কয়েকজন রিপাবলিকান নেতাও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এতে মস্কোর প্রতি ট্রাম্পের পক্ষপাতের ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।
ইউরোপীয় মিত্রদেশ ও কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনেও ভূমিকা রাখতে চান ডেমোক্র্যাটরা। তবে ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও চাপ প্রয়োগের কৌশলে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক শুধু কংগ্রেসের উদ্যোগে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইসরায়েল ইস্যুতেও ট্রাম্পকে তুলনামূলক কম সমর্থনকারী কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে। নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের অনেকে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করে প্রচার চালিয়েছেন। তাঁরা ইসরায়েলকে প্রতিবছর দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক সহায়তা বন্ধের উদ্যোগ নিতে পারেন।
নির্বাচনের দিন ট্রাম্পও ঘোষণা দিয়েছিলেন, বছরের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে এ ধরনের সহায়তা বন্ধ করা হবে। তবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনি ক্ষমতা তাঁর রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির ঘনিষ্ঠতা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা—সব মিলিয়ে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলের দীর্ঘদিনের সমর্থনে ফাটল ধরেছে। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা থাকায় ইসরায়েল নীতিতে বড় পরিবর্তন আনা ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন হতে পারে।
ক্ষমতার শেষ দুই বছরে কী করবেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দিকে এসে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব কমে যাওয়ার পর অনেক সময় পররাষ্ট্রনীতিতে বেশি মনোযোগ দেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারে। তাঁর মেয়াদের বাকি দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক অভিযান কিংবা কিউবার মতো অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা।
জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক লরা ব্লুমেনফেল্ড বলছেন, চাপের মুখে পড়লে ট্রাম্প বিদেশে একতরফাভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিজের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ইরান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি পথ রয়েছে—নতুন করে বিমান হামলা চালানো, আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা অথবা বর্তমান অচলাবস্থা বজায় রাখা। বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো রস হ্যারিসনের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই নির্ভর করবে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান ও উত্তরাধিকার কেমন রেখে যেতে চান, তার ওপর। তাঁর ভাষায়, বিশ্বে নিজের ছাপ রেখে যাওয়াই ট্রাম্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেই ছাপ ইতিবাচক হলো কি না, তা হয়তো তাঁর কাছে মুখ্য নয়।
সূত্র: রয়টার্স।