অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর পদত্যাগ করলেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট
ব্যাপক আর্থিক সংকট, ডিজিটাল ব্যাংকের পতন ও তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগ করেছেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় পদত্যাগের ঘোষণা দেন পেনা।
তিনি বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার কথা বিবেচনা করেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে কোনো সময় ব্যর্থ হয়ে থাকলে জনগণের কাছে ক্ষমা চান তিনি। তবে তার পদত্যাগের ঘোষণা গ্রহণ না করে অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কংগ্রেস।
দেশটির নিম্নকক্ষের আইনপ্রণেতারা ৭৮-০ ভোটে পেনার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দেন। পরে সিনেটেও অভিশংসন কার্যক্রম শুরু হয়। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তাকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পেনা নিজেও সিনেটের কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন।
পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বৃহস্পতিবার কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশন বসে। তবে পেনার দল কলোরাডো পার্টির আইনপ্রণেতারা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করলে প্রয়োজনীয় কোরাম সংকট দেখা দেয়। ফলে তার পদত্যাগ গ্রহণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই অধিবেশন শেষ হয়। অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ও কলোরাডো পার্টির নেতা হোরাসিও কার্তেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেনার অভিশংসনের পক্ষে অবস্থান জানান। তিনি বলেন, সরকারি, বেসরকারি ও পেনশন তহবিলের অর্থ আত্মসাতের পক্ষে তাদের দল অবস্থান নেবে না।
মূলত চলতি সপ্তাহের শুরুতে দেশটির ডিজিটাল ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ইউএনও ব্যাংকের আর্থিক সংকট প্রকাশ্যে এলে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, প্রতিষ্ঠানটি আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আর্থিক সক্ষমতার অনুপাত বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। হিসাব সংশোধনের পর দেখা যায়, লোকসান সামাল দিতে ব্যাংকের যে পরিমাণ মূলধন থাকার কথা, প্রকৃত মূলধন তার অর্ধেকেরও কম।
ব্যাংকটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ গ্রাহক নিজেদের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহক থাকার দাবি করেছিল, যা প্যারাগুয়ের মোট ৬৫ লাখ জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। ব্যাংকটির মাধ্যমে পেনশনসহ বিভিন্ন সরকারি তহবিলের অর্থও পরিচালিত হতো। ফলে ব্যাংকটির পতনে সাধারণ গ্রাহকদের পাশাপাশি পেনশনভোগীরাও সংকটে পড়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইউএনওর অবশিষ্ট অর্থ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও অনুমোদন করেছে কংগ্রেস। তবে ব্যাংকটির কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্লোস কারভাল্লোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরে তিনি পদত্যাগ করেন। তাঁর স্থলে নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকপ্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকটির মূল প্রতিষ্ঠান গ্রুপো ভাসকেজের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পেনার ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতাও সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। পেনা আগে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারধারী ছিলেন। তবে তার দাবি, ২০২৫ সালে তিনি নিজের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু আইনপ্রণেতারা তার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন। ব্যাংকটির আর্থিক দুরবস্থা সম্পর্কে তথ্য গোপনে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
এদিকে ব্যাংকটির পতনের ঘটনায় প্যারাগুয়ের অ্যাটর্নি জেনারেল তিনটি ফৌজদারি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব তদন্তে ব্যাংকটির তদারকি এবং প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারি তহবিল রাখার সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখা হবে। পেনা জানিয়েছেন, তদন্তে তিনি সহযোগিতা করবেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করা, আমানত সুরক্ষা তহবিলের যথাযথ ব্যবহার এবং জনগণের সম্পদ সুরক্ষিত রাখা।
ব্যাংক ধসের ঘটনায় পেনার পদত্যাগের দাবিতে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভও হয়েছে। বৃহস্পতিবার কংগ্রেস ভবনের কাছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ছবি প্রকাশিত হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে দেশটির রক্ষণশীল কলোরাডো পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হন সান্তিয়াগো পেনা। তাকে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ করা হলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে পারেন। তবে অভিশংসন প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হলে পেনা সাবেক প্রেসিডেন্টদের মতো আজীবন সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ ও সংশ্লিষ্ট আইনি সুরক্ষা পাবেন না।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি ও রয়টার্স।