০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৫:৪১

নির্বাচনে হারের পর চাপে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সম্পর্ক!

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।  © আনাদোলু এজেন্সি

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর রাজনৈতিক চাপে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। এর মধ্যে ইসরায়েলকে দেওয়া প্রায় ৩৮০ কোটি ডলারের বার্ষিক সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণায় দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।

নির্বাচনী ফলাফল, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত—এই তিন বিষয় এখন দুই নেতার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান নেতানিয়াহু সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইসরায়েলকে বছরে ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে। ২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের সঙ্গে করা ১০ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ২০১৯ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত এ সহায়তা দেওয়ার কথা।

তবে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে দেওয়া এই সহায়তা বন্ধ করা হবে।’ তাঁর দাবি, নেতানিয়াহুর সঙ্গে কয়েক মাস আগেই এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে এবং ইসরায়েলের এখন আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই।

ট্রাম্পের ঘোষণায় অবশ্য সহায়তা বন্ধের প্রক্রিয়া বা বিদ্যমান চুক্তির বাকি সময়ের অর্থায়ন কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও এ ঘোষণায় বিস্মিত হয়েছেন। কারণ বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার বড় অংশ ইসরায়েলের অস্ত্র ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার কাজে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা ও উন্নয়নের অর্থও রয়েছে। গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের মধ্যে এ সহায়তা বন্ধ হলে ইসরায়েলের সামরিক ব্যয় ও অস্ত্র সংগ্রহের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে নেতানিয়াহু নিজেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানোর পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব, দুই দেশের সম্পর্ককে সরাসরি সহায়তার পরিবর্তে যৌথ বিনিয়োগ, অস্ত্র উন্নয়ন ও উৎপাদনভিত্তিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া যেতে পারে। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজের বিশ্লেষণেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে।

ইসরায়েলের সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা
গত ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আর আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ ২৭টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হলেও সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ সরকার গঠনের বিষয়ে বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। আরব দলগুলোর সমর্থন পেলে আইজেনকোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে এখনো রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে।

ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকার গঠনের আলোচনা কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। বিশেষ করে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আরব দলগুলোর জোট গঠনের প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরও ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত রয়েছে।

তবে নির্বাচনের ফল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপে ফেললেও এখনই তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটছে না। নতুন সরকার গঠনের আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে কী প্রভাব পড়বে
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। গাজা যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠিত হলে গাজা যুদ্ধ, ইরান বিষয়ক নীতি এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে দেশটির অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নতুন সরকারের রাজনৈতিক সমীকরণ ও জোটসঙ্গীদের অবস্থানের ওপর এসব সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন প্রণয়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে।

এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ইসরায়েলকে সহায়তার বিষয়টি মার্কিন নির্বাচনে রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কও নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলেছে, অন্যদিকে ইসরায়েলে সরকার গঠনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে এসব পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এপি, আল-জাজিরা, এবিসি নিউজ।