০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৮

সিনেটে হারল ট্রাম্পের দল, হাউজেও এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন  © রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। এখন পর্যন্ত সিনেটের প্রয়োজনীয় ৫১টি আসন পেয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে নিম্নকক্ষ হাউজ নির্বাচনেও এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারানোর মুখে পড়েছে ট্রাম্পের দল।

সিনেটের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা ৫২টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছেন। রিপাবলিকানরা ৪০ টি আসনে জয় পেয়েছেন। অন্যদিকে ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে এখন পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা ২১০টি আসনে জয় পেয়েছেন, রিপাবলিকানরা পেয়েছেন ১০৮টি আসন। এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। ফলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দলের মধ্যে লড়াই চলছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও স্থানীয় পর্যায়েও ভোট হয়েছে। নির্বাচনের ফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

যেসব অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয়
সিনেট নির্বাচনে সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস, ওহাইও ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এসব অঙ্গরাজ্যের কয়েকটি দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করে সিনেট আসনটি পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। ডারলিন গ্রাহাম প্রয়াত দীর্ঘদিনের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম অঙ্গরাজ্যটি থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট নির্বাচনে জয় পেলেন।

প্রতিবেশী নর্থ ক্যারোলাইনাতেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর রয় কুপার। তিনি রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করেছেন।

টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও ধর্মতত্ত্বের শিক্ষার্থী জেমস টালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী এবং অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে হারিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঙ্গরাজ্যটিতে এই জয় ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৯৪ সালের পর টেক্সাসে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয় পাওয়ার ঘটনা ঘটেনি।

কানসাসেও রিপাবলিকানদের আধিপত্যে আঘাত হেনেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন। একটি মেগাচার্চের যাজক হ্যামিলটন বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন। অঙ্গরাজ্যটিতে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এ ছাড়া ওহাইওতে বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর জন হাসটেডকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউন।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিদায়ী ১১৯তম কংগ্রেসে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের ছিল ৪৫টি। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন দুজন স্বতন্ত্র সদস্য, যাঁরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতেন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারণ, শুনানি আয়োজন এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাড়তি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, বিচারক এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পদে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন অনুমোদনের দায়িত্বও সিনেটের।

সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়াতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত ও শুনানি আয়োজনের সুযোগও পাবে দলটি।

ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ শেষ
২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হোয়াইট হাউস, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল। মার্কিন রাজনীতিতে এই অবস্থাকে ‘ট্রাইফেক্টা’ বলা হয়। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্য দিয়ে সেই একক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটেছে। প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও বাজেটসংক্রান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও বড় বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সদস্যদের মেয়াদ ছয় বছর। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। সিনেটের সব আসনে একসঙ্গে নির্বাচন হয় না; সাধারণত প্রতি দুই বছর অন্তর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়।

এবার সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং ওহাইও ও ফ্লোরিডায় দুটি বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনে যোগ দেওয়ায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া আসনে বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেই প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকে। তবে আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন বাড়ে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিপাবলিকানরা বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে যায়, তার ওপর আগামী দুই বছরের মার্কিন রাজনীতির গতিপথ অনেকটা নির্ভর করবে।

সূত্র: রয়টার্স