জেন-জি বিক্ষোভে উত্তাল ইউরোপের দেশ জার্মানি
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়নের ঘাটতি ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে জার্মানির বিভিন্ন শহরে তরুণদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দিনের বেলা হাজারো মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশ নিলেও রাতে ফ্রাঙ্কফুর্টের কেন্দ্রীয় এলাকায় দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। দেশের বার্লিন, কোলন ও হামবুর্গেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। খবর বিবিসির
বিক্ষোভের সময় জরুরি সেবাকর্মীদের লক্ষ্য করে আতশবাজি, পাথর ও বোতল নিক্ষেপ করেন বিক্ষোভকারীদের একাংশ। জার্মানির আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ফ্রাঙ্কফুর্টে রাতভর অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
জার্মানিতে ‘জেন জেড রেগেল্ট’ (জেন জেড দায়িত্ব নিচ্ছে) নামের একটি প্রচারগোষ্ঠী এ বিক্ষোভের আয়োজন করে। স্কুলে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, সরকারি ব্যয় কমানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে যোগদানের বিরোধিতা ছিল তাদের দাবির মধ্যে।
জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডোব্রিন্ড রবিবার (১ নভেম্বর) বলেন, রাতভর পুলিশ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্যারিসে দেখা সহিংসতার মতো পরিস্থিতি ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে দাঙ্গা ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির আহ্বান জানান তিনি। ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান বিপণিবিতানের বড় একটি অংশ রাতভর বন্ধ করে রাখে পুলিশ। শহরটিতে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক মুখপাত্র।
ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিনের কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা ১৮ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। আয়োজকেরা তাদের ওয়েবসাইটে এর প্রায় দ্বিগুণ মানুষের উপস্থিতির প্রত্যাশা জানিয়েছিলেন। তবে জার্মান সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।
‘জেন জেড রেগেল্ট’-এর মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিখ বলেন, ‘আমাদের বিক্ষোভ যুদ্ধ ও জবরদস্তির পক্ষে নয়, বরং শান্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে লড়াইয়ের জন্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য আরও ভালো সহায়তা নিশ্চিত করা। আমরা বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে যোগদানের বিরোধী এবং দায়িত্বের বোঝা আরও ন্যায্যভাবে বণ্টনের পক্ষে।’
শনিবার রাতে ফ্রাঙ্কফুর্ট পুলিশ জানায়, শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় ‘সহিংস দাঙ্গা’ চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পুলিশ ইউনিট মোতায়েন করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি দোকানের জানালা ভাঙচুর করা হয় এবং জরুরি সেবাকর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করা হয়।
কর্মকর্তারা জানান, একটি অস্ত্রের দোকানের জানালাও ভাঙা হয়েছে। এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের পর দুটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া কয়েকটি দোকানে ঢুকে জুতা ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করা হয়েছে।
জার্মানির হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক বলেন, ফ্রাঙ্কফুর্টের বিক্ষোভে প্রায় ১০০ জন চিহ্নিত বামপন্থী উগ্রবাদী অনুপ্রবেশ করেছিলেন। বিক্ষোভের শেষ পরিণতিকে তিনি লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সের ঘটনাগুলোর ছবি আমাদের সবার মনে রয়েছে—লুটপাট, বাড়িঘরে আগুন, পুলিশের গাড়িতে আগুন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা। এ ক্ষেত্রে ফ্রান্সকে কোনোভাবেই অনুসরণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।’
জার্মানির অন্য শহরগুলোতেও দিনের বেলার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পর সহিংসতার ঘটনা ঘটে। কোলনে প্রধান রেলস্টেশনের কাছে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার খবর জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। এ সময় তাদের লক্ষ্য করে বোতল ছোড়া হয় এবং একটি সাইকেল নিক্ষেপ করা হয়।
কোলন পুলিশের প্রধান জোহানেস হারমানস বলেন, ‘যেসব তরুণ নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করতে চেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সহিংসতা ছাড়া আর কিছুই মাথায় ছিল না—এমন উগ্রবাদীদের অনুপ্রবেশের ঘটনা গভীরভাবে দুঃখজনক।’
দিনের বড় বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় বার্লিনে তুলনামূলক ছোট একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ২৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং ৫৬ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে বার্লিন পুলিশ।
হামবুর্গে কালো পোশাক পরা একদল বিক্ষোভকারী আতশবাজি ফোটান এবং বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেন। দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম এনডিআর জানিয়েছে, এ ঘটনায় ১২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জার্মানির বিক্ষোভের একই দিনে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে বড় আকারের প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ফ্রান্সে টানা তৃতীয় সপ্তাহান্তে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিম্নমানের সরকারি সেবার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন তিন লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ। দেশটির বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচিতে শিক্ষা খাতের সংকটও গুরুত্ব পায়।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সজুড়ে হাজারো পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। শনিবারের বিক্ষোভে দেশজুড়ে ৭৭০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগের সপ্তাহের বিক্ষোভের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় অর্ধেক।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, পেট্রলবোমার আঘাতে এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরে এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তদন্ত শুরু করেন দেশটির সরকারি কৌঁসুলিরা। প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক শ দাঙ্গাকারী বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছেন।
ফ্রান্সের বিক্ষোভ আয়োজক গোষ্ঠী ‘জিলেট জন’ বা ইয়েলো ভেস্টস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে দেশজুড়ে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই ‘গ্রেনেডের’ আঘাতে আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
অক্টোবরের শুরুর দিকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত এক ধরনের স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত করে ফ্রান্স। এর আগে ওই গ্রেনেডের আঘাতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত উড়ে যায়। তবে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মঁদ জানিয়েছে, পরবর্তী বিক্ষোভগুলোতে পুলিশ অন্য ধরনের স্টান গ্রেনেড ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে।
ইতালিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। রোম ও তুরিনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পর্তুগালে আবাসনসংকটের প্রতিবাদে হাজারো মানুষের মিছিলের পর নতুন করে গড়ে ওঠা একটি তাঁবুর শিবির সরিয়ে দিতে অভিযান চালায় পুলিশ। দেশটিতে ভাড়াসংক্রান্ত একটি নতুন বিল আবাসনসংকট আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা বিক্ষোভকারীদের। গত এক দশকে দেশটিতে বাড়ির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, গ্রিস, সার্বিয়া ও আলবেনিয়াতেও রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা।
দেশভেদে বিক্ষোভকারীদের দাবিতে পার্থক্য থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনের সুযোগ, শিক্ষার মান এবং সরকারি সেবায় ব্যয় সংকোচনের বিষয়গুলো প্রায় সব কর্মসূচিতেই গুরুত্ব পেয়েছে।