৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪৯

আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠন করবে না নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু  © রয়টার্স

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এর আগে দল গুলোর বিরুদ্ধে ‘নির্বাচন চুরির’ অভিযোগ তুলেছিল তাঁর দল লিকুদ। তবে অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের নির্বাচন কর্তৃপক্ষ।

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফলে কোনো রাজনৈতিক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের আসন ৪৮টি। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহু লিখেছেন, ‘তাদের সঙ্গে সরকার গঠন করা নিষিদ্ধ।’ এর মাধ্যমে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক জোট গঠনের বিরোধিতার কথা স্পষ্ট করেছেন তিনি। অন্যদিকে, নির্বাচনে আরব দলগুলোর উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পর তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচন চুরির অভিযোগ তুলেছে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ। তবে ভোট জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তে নির্বাচনের সামগ্রিক স্বচ্ছতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা পরিকল্পিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের নির্বাচন কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ভোট গণনা শেষে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো পক্ষেরই নেই। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি। আগামী ৪ নভেম্বর ফল ঘোষণা ও অনুমোদনের কথা রয়েছে। এদিকে নতুন সরকার গঠনের পথ খুঁজতে বিরোধী নেতাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গাদি আইজেনকোট। দ্রুত সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। একই দিন ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলানের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।

বিরোধী জোটের নেতাদের মধ্যে গোলানই আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি পৃথকভাবে আরব দল রা'আমের নেতা মানসুর আব্বাসের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। তবে বিরোধী জোটের জন্য সরকার গঠনের সমীকরণ মেলানো সহজ নয়। কারণ, আইজেনকোট আগে থেকেই আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট বা অংশীদারত্বে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আসনে এগিয়ে নেতানিয়াহুর লিকুদ
দলভিত্তিক ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেয়েছে ২৭টি আসন। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের ইয়েশ আতিদ পেয়েছে ২১টি আসন। এ ছাড়া বেইয়াহাদ ১২টি, জয়েন্ট লিস্ট ১১টি, দ্য ডেমোক্র্যাটস ৮টি এবং আরব দল রা'আম ৮টি আসন পেয়েছে।

অন্য দলগুলোর মধ্যে ইসরায়েল বেইতেনু ৭টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম ৭টি, ওতজমা ইহুদিত ৭টি, শাস ৬টি এবং রিলিজিয়াস জায়োনিজম ৬টি আসন পেয়েছে। জোটের হিসাবে নেতানিয়াহুর পক্ষে রয়েছে ৫৩টি আসন। আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি। বাকি ১৯টি আসন রয়েছে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর হাতে। ফলে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো পক্ষ।

আসনের পাশাপাশি প্রাপ্ত ভোটের হিসাবেও এগিয়ে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর দল লিকুদ পেয়েছে ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯১ ভোট, যা মোট ভোটের ২০ দশমিক ৫২ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গাদি আইজেনকোট পেয়েছেন ৯ লাখ ৭ হাজার ৫৬৬ ভোট বা ১৬ দশমিক ০৫ শতাংশ।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা নাফতালি বেনেট পেয়েছেন ৫ লাখ ২৭ হাজার ৬৪ ভোট, যা মোট ভোটের ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ইউসেফ জাবারিন পেয়েছেন ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৭৬৩ ভোট বা ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। ইয়ার গোলান পেয়েছেন ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩ ভোট বা ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া আভিগদর লিবারম্যান পেয়েছেন ৩ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৫ ভোট বা ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। মানসুর আব্বাস পেয়েছেন ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৩৯১ ভোট। ইতামার বেন-গভির পেয়েছেন ৩ লাখ ২৩ হাজার ৮০০ ভোট বা ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

ইয়াকভ আশের পেয়েছেন ৩ লাখ ১১ হাজার ৪৭৩ ভোট (৫ দশমিক ৫১ শতাংশ), আরিয়েহ দেরি ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮৯ ভোট (৫ দশমিক ২৭ শতাংশ) এবং বেজালেল স্মোত্রিচ পেয়েছেন ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৪ ভোট (৫ দশমিক ০৮ শতাংশ)। অন্যান্য প্রার্থী ও দল সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ৩ লাখ ৫ হাজার ২৬৯ ভোট, যা মোট ভোটের ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ।

প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচনে মোট ৭৩ লাখ ৩১ হাজার ৯৮১ জন ভোটারের মধ্যে ৫৬ লাখ ৭৮ হাজার ৮১১টি ভোট গণনা করা হয়েছে। ভোট পড়ার হার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ আরব দলগুলো
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। নেতানিয়াহুর জোটের হাতে রয়েছে ৫৩টি আসন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তাদের আরও আটটি আসন প্রয়োজন। অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের প্রয়োজন আরও ১৩টি আসন।

আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর হাতে থাকা ১৯টি আসন এ কারণে সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বিরোধী শিবিরের মধ্যেই এসব দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট কিংবা তাদের সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনার বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দেশটির ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সব মিলিয়ে নির্বাচনে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ইসরায়েলে রাজনৈতিক দর-কষাকষি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নেতানিয়াহু আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করলেও বিরোধী শিবিরের জন্য তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় সমর্থন আদায় করতে পারে, তা এখনো অনিশ্চিত।

সূত্র: আলজাজিরা ও রয়টার্স