যুক্তরাষ্ট্রে ৮ লাখ শিক্ষার্থীর পরিচয় চুরি করে হাতিয়ে নিল ৩ কোটি ডলার
যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি শিক্ষাঋণ ও অনুদানের অর্থ হাতিয়ে নিতে ভুয়া শিক্ষার্থী পরিচয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। এ ধরনের প্রতারণার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির বিচার বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ ও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। তদন্তে এখন পর্যন্ত আট লাখ ৩০ হাজারের বেশি সন্দেহজনক শিক্ষাসহায়তা হিসাব শনাক্ত হয়েছে। এসব জালিয়াতির ঘটনায় অন্তত তিন কোটি ২০ লাখ ডলারের ক্ষতির তথ্য পেয়েছে এফবিআই।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দেশটির বিচার বিভাগের বরাতে এ খবর জানিয়েছে সংবামাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ কেনীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে সরকারি শিক্ষাসহায়তার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ লাখ ডলারের শিক্ষাঋণ ও অনুদান অবৈধভাবে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের পরিচয় চুরি করে বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর তাঁদের নামে সরকারি শিক্ষাঋণ ও অনুদানের আবেদন করেন। কলেজগুলো টিউশন ফি ও অন্যান্য খরচের অর্থ রেখে দেওয়ার পর বাকি টাকা অভিযুক্তদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংক হিসাবে জমা হতো। পরে সেই অর্থ কেনিয়ায় থাকা সহযোগীদের কাছে পাঠানো হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের প্রতারণাকে ‘ঘোস্ট স্টুডেন্ট’ বা ভুয়া শিক্ষার্থী জালিয়াতি বলা হচ্ছে। প্রতারকেরা চুরি করা পরিচয় ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাসে ভর্তি হন এবং সরকারি আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করেন। অর্থ পাওয়ার পর তাঁরা পড়াশোনা বন্ধ করে উধাও হয়ে যান। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি পরিচয় চুরির শিকার ব্যক্তিদের নামেও প্রতারণার মাধ্যমে ঋণের দায় তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের জাতীয় জালিয়াতি দমন বিভাগের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কলিন এম ম্যাকডোনাল্ড এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং বড় পরিসরে সংঘটিত সংগঠিত জালিয়াতি। প্রতারকেরা যত দিন সম্ভব ভুয়া শিক্ষার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত থেকে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিতে চায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে তদন্তকারীরা ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৪০টি সম্ভাব্য জাল শিক্ষাসহায়তা হিসাব শনাক্ত করেন। এসব হিসাবের সঙ্গে প্রায় ১৩ কোটি ডলারের অর্থের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। হিসাবগুলো নিষ্ক্রিয় করার জন্য শিক্ষা বিভাগকে সুপারিশ করা হয়েছে। এফবিআইয়ের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সহকারী পরিচালক হেইথ জানকে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সংস্থাটি এ ধরনের জালিয়াতিতে অন্তত ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের ক্ষতির তথ্য পেয়েছে।
প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছে এফবিআই। সংস্থাটির ২৬টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে এ ধরনের ৪৫টি তদন্ত চলছে। বিচার বিভাগের ধারণা, এ ধরনের জালিয়াতি অন্তত ২০২১ সাল থেকে চলে আসছে। এর সামগ্রিক আর্থিক ক্ষতি ২০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। তবে তদন্ত এখনো চলমান।
যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগের আন্ডারসেক্রেটারি নিকোলাস কেন্ট এ ধরনের জালিয়াতি বৃদ্ধির জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের শিথিল যাচাইব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, করোনা মহামারির সময় শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার আবেদনে তথ্য যাচাইয়ের কিছু শর্ত শিথিল করা হয়েছিল। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রমাণপত্র চাওয়ার নিয়ম কমানো হয়।
কেন্টের দাবি, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন জালিয়াতি শনাক্তের উদ্যোগ জোরদার করেছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে আর্থিক সহায়তার আবেদনকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে কলেজে সরকারি পরিচয়পত্র দেখানোর নিয়ম চালু করা হয়েছে। তবে নতুন যাচাইব্যবস্থা নিয়েও উচ্চশিক্ষা খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব স্টুডেন্ট ফিন্যান্সিয়াল এইড অ্যাডমিনিস্ট্রেটরসের নীতিবিশ্লেষণ পরিচালক জিল দেশজান বলেছেন, কিছু প্রতারক এখনো যাচাইয়ের ফাঁক গলে যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত যাচাইয়ের কারণে প্রকৃত শিক্ষার্থীদেরও ভুলভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশজানের মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষাসহায়তা নিয়ে জালিয়াতির ঘটনা বেড়েছে। কলেজগুলোও অভিযোগ করেছে, শিক্ষার্থী পরিচয়ে প্রতারকেরা ভর্তি হয়ে আর্থিক সহায়তার অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে কমিউনিটি কলেজগুলো প্রতারকদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে টিউশন ফি তুলনামূলক কম হওয়ায় ঋণ ও অনুদানের বড় অংশ শিক্ষার্থীদের হাতে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট