৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৭

ইসরায়েলের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা, কে পেলেন কতটি আসন

ইসরায়েলের নির্বাচন  © সংগৃহীত

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট গণনা শেষ হয়েছে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কোনো রাজনৈতিক জোট। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো পক্ষ। এতে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। খবর আলজাজিরার।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ভোট গণনা শেষে প্রকাশিত ফলাফলে এ চিত্র উঠে এসেছে। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি। আগামী ৪ নভেম্বর ফল ঘোষণা ও অনুমোদনের কথা রয়েছে। নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে হবে দুই পক্ষকে। বিশেষ করে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন নতুন সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে বৃহস্পতিবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গাদি আইজেনকোট। দ্রুত সরকার গঠনের উপায় নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। এ ছাড়া ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলানের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। এদিকে বিরোধী জোটের নেতাদের মধ্যে গোলানই আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি পৃথকভাবে আরব দল রা'আমের নেতা মানসুর আব্বাসের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

তবে বিরোধী জোটের জন্য সমীকরণ মেলানো সহজ নয়। কারণ, আইজেনকোট আগে থেকেই আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট বা অংশীদারত্বে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে এসব দলের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নির্বাচনে কার কত আসন
দলভিত্তিক ফলাফলে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেয়েছে ২৭টি আসন। আইজেনকোটের ইয়েশ আতিদ পেয়েছে ২১টি আসন। এ ছাড়া বেইয়াহাদ ১২টি, জয়েন্ট লিস্ট ১১টি, দ্য ডেমোক্র্যাটস ৮টি এবং আরব দল রা'আম ৮টি আসন পেয়েছে। অন্য দলগুলোর মধ্যে ইসরায়েল বেইতেনু ৭টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম ৭টি, ওতজমা ইহুদিত ৭টি, শাস ৬টি এবং রিলিজিয়াস জায়োনিজম ৬টি আসন পেয়েছে।

জোটের হিসাবে নেতানিয়াহুর পক্ষে রয়েছে ৫৩টি আসন। আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসন ৪৮টি। বাকি ১৯টি আসন রয়েছে আরব দলগুলোর হাতে।

ভোটে এগিয়ে নেতানিয়াহু
প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের হিসাবেও এগিয়ে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর দল লিকুদ পার্টি পেয়েছে ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯১ ভোট, যা মোট ভোটের ২০ দশমিক ৫২ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন গাদি আইজেনকোট। তিনি পেয়েছেন ৯ লাখ ৭ হাজার ৫৬৬ ভোট, যা মোট ভোটের ১৬ দশমিক ০৫ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা নাফতালি বেনেট পেয়েছেন ৫ লাখ ২৭ হাজার ৬৪ ভোট। তাঁর ভোটের হার ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।

এ ছাড়া ইউসেফ জাবারিন পেয়েছেন ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৭৬৩ ভোট বা ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। ইয়ার গোলান পেয়েছেন ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩ ভোট, যা মোট ভোটের ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আভিগদর লিবারম্যান পেয়েছেন ৩ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৫ ভোট বা ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। একই ভোটের হার নিয়ে মানসুর আব্বাস পেয়েছেন ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৩৯১ ভোট। ইতামার বেন-গভির পেয়েছেন ৩ লাখ ২৩ হাজার ৮০০ ভোট বা ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

এ ছাড়া ইয়াকভ আশের পেয়েছেন ৩ লাখ ১১ হাজার ৪৭৩ ভোট (৫ দশমিক ৫১ শতাংশ), আরিয়েহ দেরি ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮৯ ভোট (৫ দশমিক ২৭ শতাংশ) এবং বেজালেল স্মোত্রিচ পেয়েছেন ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৪ ভোট (৫ দশমিক ০৮ শতাংশ)। অন্যান্য প্রার্থী ও দল সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ৩ লাখ ৫ হাজার ২৬৯ ভোট, যা মোট ভোটের ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ।

প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচনে মোট ৭৩ লাখ ৩১ হাজার ৯৮১ জন ভোটারের মধ্যে ৫৬ লাখ ৭৮ হাজার ৮১১টি ভোট গণনা করা হয়েছে। ভোট প্রদানের হার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

কারচুপির অভিযোগ
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিদেশি হস্তক্ষেপ ও কারচুপির অভিযোগ তুলেছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। দলটির দাবি, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো বিদেশি সহায়তায় নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ জানিয়েছেন, বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে কিছু গুরুতর সন্দেহের কথা তাঁকে জানানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য তিনি দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেটের কাছে পাঠিয়েছেন। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করেননি তিনি।

নেতানিয়াহুর এসব অভিযোগের সমালোচনা করেছেন আইজেনকোট। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের ফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। ব্যক্তিগত স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে কি নতুন নির্বাচন?
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব, গাজা যুদ্ধ এবং তাঁর সরকারের ভূমিকা নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। এখন সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা চলবে। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা নিয়ে বিরোধী শিবিরের মতপার্থক্য এবং নেতানিয়াহুর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। কোনো পক্ষ প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে সরকার গঠন আটকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসরায়েলে আবারও নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

সূত্র: আলজাজিরা, দ্য টাইমস অব ইসরায়েল ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।